‘ছাদে ইয়াবায় বাধা দেওয়াই ’ শিক্ষক পরিবার ৪ জনকে হত্যা
- আপডেট সময় : ০৩:০৩:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
- / 113
শান্ত, নিরিবিলি বাড়ির ছাদে রাতের আঁধারে বসেছিল নেশার আসর। আর সেই বিষাক্ত ধোঁয়া চোখ এড়ায়নি অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষকের। প্রতিবাদ জানাতেই যেন তেড়ে এলো সাক্ষাৎ জমদূত! গামছা দিয়ে গলার শ্বাস রোধ করে গৃহকর্তা, তারপর এগিয়ে আসা স্ত্রী, মেয়ে এবং সবশেষে ১২ বছরের নিষ্পাপ শিশুটিকে বালিশ চাপা দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা! কেবল খুনই নয়, লাশের পাশে বসেই বাথরুমে গোসল, ফ্রিজ খুলে শসা-খেজুর খাওয়া এবং বাকি ইয়াবাটুকু সেবন করে দিনদুপুরে নির্বিকার মুখে বেরিয়ে যাওয়া!
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫) ও তাঁর পুরো পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যার পেছনে বেরিয়ে এসেছে এমন হাড়হিম করা ও রোমহর্ষক তথ্য।
রোববার (২৩ আগস্ট, ২০২৬) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এই নজিরবিহীন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। এ ঘটনায় ভোরেই অভিযান চালিয়ে দুই মূল ঘাতক—নগরীর মাছুয়াপাড়ার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাসকে (১৯) গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
ইয়াবার ধোঁয়া, গামছার ফাঁস ও চার লাশের সারি
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে নিহত গণপতির বাসভবন সংলগ্ন দেবপতির তিনতলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে লাফিয়ে গণপতির দোতলা বাসার ছাদে নেমে আসে অভিযুক্ত দুই যুবক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিল।
ওই সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী টের পেয়ে ছাদে আসেন এবং ছাদে এভাবে মাদক সেবনে তীব্র বাধা দেন। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে দুই যুবক। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
গণপতির আর্তচিৎকার শুনে নিচের ঘর থেকে উদ্ধার করতে ছুটে আসেন স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০)। স্বামী রক্তের সাগরে ঢলে পড়ছেন দেখে তিনি চিৎকার দিলে তাকেও একইভাবে কাপড়ের ফাঁস দিয়ে হত্যা করে খুনিরা।
বাবা-মায়ের বাঁচাও চিৎকার শুনে ছুটে আসে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫)। তাকে তিন-চার মিনিট ধরে গামছা ও কাপড় দিয়ে চেপে ধরে ব্যর্থ হয়ে শেষে ঘরে থাকা রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করা হয়। সবশেষে তাঁদের ১২ বছরের ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীকে বিছানায় চেপে ধরে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে হত্যা করা হয়।
খুন শেষে বাথরুমে গোসল, শসা-খেজুর খেয়ে সাফাই!
চার-চারটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছুঁয়ে যায়নি ওই দুই ঘাতককে। পুলিশের বর্ণনা অনুযায়ী, চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার পর খুনিরা রক্তাক্ত গা ধুয়ে বাথরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করে।
এরপর রান্নাঘর ও ডাইনিংয়ে ঢুকে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায় এবং টেবিলে রাখা খেজুর দিয়ে পেট পুজো করে! খাওয়া শেষে বাকি থাকা ইয়াবাটুকুও পরম নিশ্চিন্তে সেবন করে তারা। ততক্ষণে দিনের আলো ফুটে গেছে। জুমার নামাজের সময় এলাকায় লোকজনের চলাচল শুরু হলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তালা লাগিয়ে সটকে পড়ে তারা।
হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দিতে ঘরবাড়ি তছনছ করে এবং স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে একটি পরিত্যক্ত মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে রাখে তারা।
‘অতিদ্রুত চার্জশিট দেওয়া হবে’: পুলিশ কমিশনার
সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন—
“ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াই এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ। গ্রেফতারকৃত দুই আসামি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুরো ঘটনার বিষদ ও রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়েছে। মামলাটির তদন্ত এখনও চলছে এবং খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করা হবে।”
উল্লেখ্য, শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ঘর থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের অর্ধগলিত ও রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।












