আমার মাইয়ার লাশ আইনা দাও: সৌদিতে সুইটির মৃত্যুদণ্ডে মায়ের হাহাকার
- আপডেট সময় : ০৮:০৫:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
- / 96
দুটো ভাঙা সংসার, স্বামীর প্রতারণা আর বৃদ্ধ বাবার চরম দারিদ্র্য—জীবনজুড়ে কেবলই ছিল বঞ্চনার ইতিহাস। পরিবারের অভাব মেটাতে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মেয়ে সুইটি আক্তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এক লহমায় পরিণত হলো নিকষ কালো ট্র্যাজেডিতে। পবিত্র মক্কা নগরীতে অনৈতিক কাজের অভিযোগ এনে সৌদি আরবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
গত বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম ‘এসপিএ’ (সৌদি প্রেস এজেন্সি) নিশ্চিত করেছে যে, দুই বাংলাদেশি নাগরিক—নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহুরুল আলম জানিয়েছেন, সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির সাজা কার্যকরের খবরটি তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেছেন।
অভাবের সংসার থেকে ফাঁসির মঞ্চে সুইটি
সুইটি আক্তারের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার একটি গ্রামে। দিনমজুর বাবা মো. ফজল মিয়া ও মা জহুরা বেগমের পাঁচ বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলেন তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রথম বিয়ে হলেও সেই সংসার টিকেনি। পরবর্তীতে পরিবারের চাপে দ্বিতীয় বিয়ে হলেও স্বামী সৌদি আরবে গিয়ে সুইটির সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
নিজের ৯ বছরের কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে ও বাবার ঋণ মিটাতে ২০২৩ সালের মার্চে এক এজেন্সির মাধ্যমে সৌদিতে যান সুইটি। সেখানে কাজ নেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় গ্রেফতার হন তিনি।
পরিবারকে ফোনে সুইটি জানিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করা অন্য নারীরা বেআইনিভাবে একটি গাড়ি কেনায় সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ তাঁকেও ধরে নিয়ে গেছে। এরপর দীর্ঘ দিন জেলেই কাটে তাঁর জীবন।
‘লাশটা অন্তত আইনা দাও, ওরে এক নজর দেহুম!’
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে সুইটির মির্জাপুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভীড়। ঘরের বারান্দায় বসে অঝোরে কাঁদছিলেন মা জহুরা বেগম।
কান্নায় ভেঙে পড়ে মা জহুরা বেগম আকুতি জানান, “আমি কেমনে বাঁচুম রে, আমার সুইটিরে আইনা দ্যাও। মা তুই কত দুঃখ পাইয়া গেলি, কেউর কাছে কইলি না… আমার মাইয়ার লাশডা অন্তত আইনা দাও, আমি ওরে এক নজর দেহুম।”
সুইটির বাবা ফজল মিয়া জানান, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) মাগরিবের পর সুইটির সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা হয়েছিল। কিন্তু সুইটি এত বড় সাজা বা মৃত্যুদণ্ডের ব্যাপারে কিছুই বুঝতে দেয়নি। হঠাৎ করেই দু’দিন পর তাঁর ফাঁসির খবর এসে পৌঁছায়।
‘ষড়যন্ত্রের শিকার সুইটি, অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়’
সুইটির স্বজন ও গ্রামবাসীদের দাবি, সহজ-সরল মেয়েটি সৌদিতে কোনো গভীর চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। সুইটির চাচাতো বোন সালমা আক্তার বলেন, “আমার চাচা মাটি কেটে সংসার চালান। চরম অভাবের মুখে পড়ে সুইটি এক বোনের কাছে মেয়েকে রেখে প্রবাসে গিয়েছিল। যে অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে তা বানোয়াট। ও এমন অপরাধ করতেই পারে না।”











