ঢাকা ০৮:৫৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গুজবের বলি কামিল পাস শামীম: গণপিটুনির পেছনের নির্মম সত্য

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৩:০৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
  • / 180

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় তথাকথিত ধর্ম অবমাননার গুজব ও সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে এক উচ্চশিক্ষিত ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার এক বর্বরোচিত ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। উন্মত্ত জনতার গণপিটুনিতে নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) সাধারণ কোনো ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘কামিল পাস’ করার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।

পারিবারিক মনমালিন্যের একটি অগোছালো গোপন রেকর্ডকে ঢাল বানিয়ে ফেসবুকে লাইভ ছড়িয়ে দিয়ে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো সাতক্ষীরা জেলায় গভীর শোক, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পারিবারিক পটভূমি ও মানসিক সংকট

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম অতীতে মারাত্মক অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলেন। সেই ট্রমার পর থেকেই তিনি দীর্ঘ দিন ধরে স্নায়বিক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। মাঝেমধ্যেই তিনি ভারসাম্য হারিয়ে অসংলগ্ন ও এলোমেলো কথাবার্তা বলতেন।

ঘটনার দুই দিন আগে নিজ স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক মনমালিন্য হয়। ওই সময় তাঁর ঘরোয়া ও অসংলগ্ন কথাগুলোর গোপন অডিও রেকর্ড করে একটি কুচক্রী মহল। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির অবচেতন মনে বলা অগোছালো কথাকে পরিকল্পিতভাবে ‘ধর্ম অবমাননা’ আখ্যা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ফেসবুক লাইভের উসকানি ও হাসপাতালে বর্বরোচিত হামলা

তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর কুলিয়া এলাকার পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনীসহ কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে ওই অডিও শোনান এবং শামীমের ওপর চড়াও হতে উগ্র জনতাকে উসকে দেন। চতুর্মুখী সামাজিক ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শামীম নিজ বাড়িতে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে গেলে সেখানেও হামলা চালানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু ঘাতক উগ্র জনতা মিছিল নিয়ে এসে সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শামীমের ওপর দ্বিতীয় দফায় নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালায়।

পরবর্তীতে অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে পুলিশি পাহারায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলা দায়ের ও দুই আসামি গ্রেফতার

এই বর্বরোচিত গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে নিহতের বড় ভাই মো. আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফেসবুক লাইভ করে উসকানি দেওয়া ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দেবহাটা থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি—মোক্তার হোসেন মোড়ল ও আসাদুল মোল্লাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে মূল উসকানিদাতা ফজলুল হক আমিনীসহ অন্য প্রধান আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ার ডিজিটাল প্রমাণ ও সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বাকিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে।

গুজবের বলি কামিল পাস শামীম: গণপিটুনির পেছনের নির্মম সত্য

আপডেট সময় : ০৩:০৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় তথাকথিত ধর্ম অবমাননার গুজব ও সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ছড়িয়ে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাতে এক উচ্চশিক্ষিত ও মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার এক বর্বরোচিত ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। উন্মত্ত জনতার গণপিটুনিতে নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) সাধারণ কোনো ব্যক্তি ছিলেন না; তিনি ইসলামি শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘কামিল পাস’ করার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন।

পারিবারিক মনমালিন্যের একটি অগোছালো গোপন রেকর্ডকে ঢাল বানিয়ে ফেসবুকে লাইভ ছড়িয়ে দিয়ে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো সাতক্ষীরা জেলায় গভীর শোক, আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

পারিবারিক পটভূমি ও মানসিক সংকট

নিহতের পরিবার ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম অতীতে মারাত্মক অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলেন। সেই ট্রমার পর থেকেই তিনি দীর্ঘ দিন ধরে স্নায়বিক ও মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। মাঝেমধ্যেই তিনি ভারসাম্য হারিয়ে অসংলগ্ন ও এলোমেলো কথাবার্তা বলতেন।

ঘটনার দুই দিন আগে নিজ স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক মনমালিন্য হয়। ওই সময় তাঁর ঘরোয়া ও অসংলগ্ন কথাগুলোর গোপন অডিও রেকর্ড করে একটি কুচক্রী মহল। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির অবচেতন মনে বলা অগোছালো কথাকে পরিকল্পিতভাবে ‘ধর্ম অবমাননা’ আখ্যা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

ফেসবুক লাইভের উসকানি ও হাসপাতালে বর্বরোচিত হামলা

তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর কুলিয়া এলাকার পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনীসহ কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে ওই অডিও শোনান এবং শামীমের ওপর চড়াও হতে উগ্র জনতাকে উসকে দেন। চতুর্মুখী সামাজিক ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে শামীম নিজ বাড়িতে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

পরিবারের সদস্যরা তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে গেলে সেখানেও হামলা চালানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু ঘাতক উগ্র জনতা মিছিল নিয়ে এসে সরকারি হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই শামীমের ওপর দ্বিতীয় দফায় নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালায়।

পরবর্তীতে অবস্থার মারাত্মক অবনতি হলে পুলিশি পাহারায় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলা দায়ের ও দুই আসামি গ্রেফতার

এই বর্বরোচিত গণপিটুনি ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাতে নিহতের বড় ভাই মো. আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফেসবুক লাইভ করে উসকানি দেওয়া ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

দেবহাটা থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি—মোক্তার হোসেন মোড়ল ও আসাদুল মোল্লাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।

তবে মূল উসকানিদাতা ফজলুল হক আমিনীসহ অন্য প্রধান আসামিরা বর্তমানে পলাতক রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সোশাল মিডিয়ার ডিজিটাল প্রমাণ ও সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বাকিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হচ্ছে।