পুলিশের বিশেষ প্রতিবেদন
দৈনিক ৩ কোটির ভাগাভাগি: যাদুকাটা লুটে একাট্টা বিএনপি-আওয়ামী লীগ
- আপডেট সময় : ০১:১৮:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 106
স্বচ্ছ সবুজ পানি আর পাহাড় ঘেঁষা নয়নাভিরাম রূপের জন্য যাদুকাটাকে বলা হয় প্রকৃতির সৌন্দর্যের বরপুত্র। কিন্তু সেই রূপের নদীই এখন রূপ নিয়েছে অসাধু রাজনৈতিক নেত্রীবৃন্দ ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের টাকার পাহাড়ে! রাজপথে রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও যাদুকাটার বালু-পাথর লুটের খেলায় একাট্টা হয়ে গেছে বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা। অবাধে পরিবেশ ধ্বংসকারী ড্রেজার ও বোমাবাজির শ্যালো মেশিন বসিয়ে তোলাই শুধু নয়, প্রতিদিন রাজকোষ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ উপায়ে পকেটে ঢুকছে কোটি কোটি টাকা।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাম্প্রতিক এক ‘অতি গোপনীয়’ নথিতে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ ও স্পর্শকাতর তথ্যচিত্র। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সুনামগঞ্জের তিন সংসদ সদস্য—সুনামগঞ্জ-১ আসনের কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের নুরুল ইসলাম নুরুল এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও স্থানীয় অসাধু প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে নদীটি খালি করে ফেলছেন।
৩ এমপির ছায়া ও ৩ কোটি টাকার ‘দৈনিক ভাগাভাগি’
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদী থেকে ড্রেজার ও বোমা মেশিনে তোলা বালু এবং নৌকাসমূহ থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ৩ কোটি টাকা তোলা হয় চাঁদাবাজি ও খাস কালেকশনের নামে। এই অবৈধ আয়ের ৫০ শতাংশ বিএনপির অসাধু চক্র, ১৫ শতাংশ আওয়ামী লীগের পলাতক ও স্থানীয় সিন্ডিকেট এবং বাকি ৩৫ শতাংশ স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং এক শ্রেণির সুবিধাবাদী সাংবাদিকদের পকেটে চলে যায়।
প্রতিবেদনে অভিযোগের তির সরাসরি তিন এমপির দিকে:
সুনামগঞ্জ-১ (কামরুজ্জামান কামরুল): তাঁর নিয়ন্ত্রণে যাদুকাটা-১ মহালের নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগ, জেলা যুবলীগের যৌথ আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর হোসেন এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এমপি কামরুলকে একটি ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি পর্যন্ত উপহার দিয়েছেন!
সুনামগঞ্জ-৪ (নুরুল ইসলাম নুরুল): ধোপাজান নদীতে চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য চালান তিনি ও তাঁর অনুসারী একাধিক মামলার আসামি মানিক মেম্বার। সেখানে প্রতি ফুট বালুতে ৫ টাকা ও প্রতি নৌকায় ২ হাজার টাকা করে তো তোলা হয়ই, উপরন্তু নদীর প্রবেশমুখে ঘনফুটে ১০ টাকা করে তোলা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ-৫ (কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন): চেলা নদীতে ড্রেজার ও বোমা মেশিন বসিয়ে জিনান এন্টারপ্রাইজের শাহ রুবেল আহমেদকে দিয়ে নদী ধ্বংসের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে।
এমনকি বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজাদ হোসেন (যিনি জুলাই বিপ্লবসংক্রান্ত একাধিক মামলার আসামি) এই তিন এমপির সঙ্গে যৌথভাবে ব্যবসায়িক সমন্বয় করছেন বলে পুলিশি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ইজারা শেষ, রিটের আড়ালে ৩০০ কোটি টাকার রাজস্ব গায়েব!
বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর বালুমহাল রেকর্ড ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। গত মার্চ মাসে সেই ইজারার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। কিন্তু আইন তোয়াক্কা না করে ইজারাদার নাছির মিয়া ও শাহ রুবেল আহমেদ হাইকোর্টে আইনি জটিলতা তৈরি করে রিট দায়ের করেন।
আইনি স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) ও মন্ত্রণালয়ের রহস্যজনক অনুমোদনের মারপ্যাঁচে গত কয়েকমাসে সরকার প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। জেলা প্রশাসনের ভূমি কমিটি ও আইনি লড়াই যথাসময়ে কড়া না হওয়ায় বছরের পর বছর খাস কালেকশন ও বেআইনি উত্তোলনের পথ সুগম থেকেছে।
বারকি শ্রমিক ও টাঙ্গুয়ার হাওরের মৃত্যুঘণ্টা
ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও পাথরের সুবাদে এ নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে বিখ্যাত রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। বার্ষিক প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট বালু ও ১ কোটি ঘনফুট বোল্ডার পাথরের ওপর প্রায় ৩০ হাজার স্থানীয় শ্রমিক নির্ভরশীল, যার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার বারকি শ্রমিক ঐতিহ্যবাহী হাত-নৌকায় বালু তোলেন।
কিন্তু রাক্ষসে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন তলদেশে বসানোর ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ তো ধ্বংস হচ্ছেই, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে ধোপাজান ও যাদুকাটার দুই পাড়ের বসতবাড়ি ও সড়ক। জীবিকা হারিয়ে দিশেহারা হাজার হাজার বারকি শ্রমিক।
দায় এড়ানোর কৌশল: মুখ খুলছেন না এমপিরা
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি নুরুল ইসলাম দাবি করেন, “কেউ হয়তো নাম ব্যবহার করতে পারে, আমি অনিয়মে জড়িত নই।” তবে সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি কামরুজ্জামান কামরুল এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি কলিম উদ্দিন মিলনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান—
“উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও রিটের আইনি লড়াই আমরা চালাচ্ছি। যাদুকাটার বালুমহালে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বড় বড় গ্রুপ জড়িত। হাইকোর্ট ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশের অচলাবস্থা নিরসনে আমরা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।”















