ঢাকা ১১:০৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া থেকে লাশ হয়ে ফিরলেন ফরিদপুরের রিয়াজ

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ১০:২৩:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪
  • / 130

ইতালি যাওয়ার জন্য দালালের হাতে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন ফরিদপুরের সালথার তরুণ মো. রিয়াজ মুন্সী (২০)। কিন্তু ইতালি যাওয়া হয়নি তার। রোববার লিবিয়া থেকে তার লাশ গ্রামের বাড়ি এসে পৌঁছে। এ সময় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

নিহত রিয়াজ ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের চরবল্লভদী গ্রামের কৃষক মো. ইউনুস মুন্সীর ছেলে।

জানা গেছে, গত রমজানের প্রথম সপ্তাহের দিকে মানব পাচারকারী চক্রের দালাল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের শাহিন খাঁর ছেলে শাকিল খাঁর মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন রিয়াজ। এ কাজে শাকিলের হয়ে রিয়াজকে ইতালি যেতে প্রলুব্ধ করে মানব পাচারকারী চক্রের আরেক এজেন্ট নগরকান্দা উপজেলার গজারিয়া গ্রামের সালাম কাজীর ছেলে আলামিন কাজী।

রিয়াজকে ইতালি নেয়ার কথা বলে তারা সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পরে তাকে আটকে ফেলা হয় একটি বন্দিশালায়। কয়েকমাস আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তারা আরো ১৫ লাখ টাকা দাবি করে রিয়াজের পরিবারের কাছে। দাবিকৃত ওই টাকা না দেওয়ায় মানব পাচারকারী চক্রটি নির্যাতন করে রিয়াজের হাত-পা ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে রিয়াজের করুণ মত্যু হয়।

নিহত রিয়াজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মো. মারুফ কাজী জানান, রিয়াজের মৃত্যুর খবরটি জেনে তারা হতাশ হয়ে যান। এরপর তারা তার লাশ দেশে ফেরত আনার জন্য বিভিন্ন স্থানে ছোটাছুটি করতে থাকেন। ব্যাপক দেনদরবার ও তদবির চালিয়ে অবশেষে তার লাশটি দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। গত রোববার ৮ সেপ্টেম্বর রিয়াজের মরদেহ ঢাকার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। সোমবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি মর্গে পাঠায় পুলিশ। রাতে গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছে তার নিথর দেহ।

এ ঘটনায় নিহত রিয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে নিহত রিয়াজের লাশ বাড়িতে পৌঁছার পরে কান্নায় ভেঙে পড়ে তার পরিবার ও স্বজনেরা।

মারুফ কাজী বলেন, রিয়াজ তার বাবার মতো কৃষিকাজ করতেন। এতে তেমন উপার্জন না হওয়ায় ব্যবসা শুরু করেন। তাতেও পোষাতে না পেরে ইতালি যাওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এ অবস্থায় স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে জায়গা-জমি বিক্রি করে ধার-কর্জ করে ইতালি যাওয়ার জন্য ১৫ লাখ টাকা তুলে দেন দালাল চক্রের হাতে।

তিনি আরো জানান, ইতালির কথা বলে সাগরপথে লিবিয়ায় নিয়ে টানা কয়েকমাস তাকে আটকে রেখে চক্রটি আরো ১৫ লাখ টাকা দাবি করে নির্মাম নির্যাতন চালাতে থাকে তার ওপরে। এতেই তার মৃত্যু হয়েছে।

বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুর রহমান সাইন বলেন, রিয়াজের লাশ এসে পৌঁছানোর পর বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে। ইতালি যাওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে রিয়াজকে নির্যাতনের খবরটি তিনি আগেই জেনেছিলেন। এ ব্যাপারে তার পরিবার মুকসুদপুর থানায় একটি মামলাও দায়ের করে।

মুকসুদপুর থানার ওসি মো. আশরাফুল আলম বলেন, রিয়াজের লাশ লিবিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়। এ ঘটনায় কিছুদিন পর থানায় একটি মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছিল। ওই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ট্যাগস :

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া থেকে লাশ হয়ে ফিরলেন ফরিদপুরের রিয়াজ

আপডেট সময় : ১০:২৩:২৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪

ইতালি যাওয়ার জন্য দালালের হাতে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন ফরিদপুরের সালথার তরুণ মো. রিয়াজ মুন্সী (২০)। কিন্তু ইতালি যাওয়া হয়নি তার। রোববার লিবিয়া থেকে তার লাশ গ্রামের বাড়ি এসে পৌঁছে। এ সময় সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে।

নিহত রিয়াজ ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের চরবল্লভদী গ্রামের কৃষক মো. ইউনুস মুন্সীর ছেলে।

জানা গেছে, গত রমজানের প্রথম সপ্তাহের দিকে মানব পাচারকারী চক্রের দালাল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের শাহিন খাঁর ছেলে শাকিল খাঁর মাধ্যমে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন রিয়াজ। এ কাজে শাকিলের হয়ে রিয়াজকে ইতালি যেতে প্রলুব্ধ করে মানব পাচারকারী চক্রের আরেক এজেন্ট নগরকান্দা উপজেলার গজারিয়া গ্রামের সালাম কাজীর ছেলে আলামিন কাজী।

রিয়াজকে ইতালি নেয়ার কথা বলে তারা সাগরপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথমে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পরে তাকে আটকে ফেলা হয় একটি বন্দিশালায়। কয়েকমাস আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে তারা আরো ১৫ লাখ টাকা দাবি করে রিয়াজের পরিবারের কাছে। দাবিকৃত ওই টাকা না দেওয়ায় মানব পাচারকারী চক্রটি নির্যাতন করে রিয়াজের হাত-পা ভেঙে দেয়। একপর্যায়ে রিয়াজের করুণ মত্যু হয়।

নিহত রিয়াজের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মো. মারুফ কাজী জানান, রিয়াজের মৃত্যুর খবরটি জেনে তারা হতাশ হয়ে যান। এরপর তারা তার লাশ দেশে ফেরত আনার জন্য বিভিন্ন স্থানে ছোটাছুটি করতে থাকেন। ব্যাপক দেনদরবার ও তদবির চালিয়ে অবশেষে তার লাশটি দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। গত রোববার ৮ সেপ্টেম্বর রিয়াজের মরদেহ ঢাকার বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। সোমবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি মর্গে পাঠায় পুলিশ। রাতে গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছে তার নিথর দেহ।

এ ঘটনায় নিহত রিয়াজের পরিবারের পক্ষ থেকে মানবপাচার আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে নিহত রিয়াজের লাশ বাড়িতে পৌঁছার পরে কান্নায় ভেঙে পড়ে তার পরিবার ও স্বজনেরা।

মারুফ কাজী বলেন, রিয়াজ তার বাবার মতো কৃষিকাজ করতেন। এতে তেমন উপার্জন না হওয়ায় ব্যবসা শুরু করেন। তাতেও পোষাতে না পেরে ইতালি যাওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এ অবস্থায় স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে জায়গা-জমি বিক্রি করে ধার-কর্জ করে ইতালি যাওয়ার জন্য ১৫ লাখ টাকা তুলে দেন দালাল চক্রের হাতে।

তিনি আরো জানান, ইতালির কথা বলে সাগরপথে লিবিয়ায় নিয়ে টানা কয়েকমাস তাকে আটকে রেখে চক্রটি আরো ১৫ লাখ টাকা দাবি করে নির্মাম নির্যাতন চালাতে থাকে তার ওপরে। এতেই তার মৃত্যু হয়েছে।

বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খন্দকার সাইফুর রহমান সাইন বলেন, রিয়াজের লাশ এসে পৌঁছানোর পর বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়েছে। ইতালি যাওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে রিয়াজকে নির্যাতনের খবরটি তিনি আগেই জেনেছিলেন। এ ব্যাপারে তার পরিবার মুকসুদপুর থানায় একটি মামলাও দায়ের করে।

মুকসুদপুর থানার ওসি মো. আশরাফুল আলম বলেন, রিয়াজের লাশ লিবিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করা হয়। এ ঘটনায় কিছুদিন পর থানায় একটি মানবপাচার আইনে মামলা হয়েছিল। ওই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।