ঢাকা ০৭:১৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নগদে ২,৩৫৬ কোটি টাকার লোপাট: অদৃশ্য কোম্পানি দিয়ে অর্থপাচার, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:২২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ মে ২০২৫
  • / 318

নগদের বিনিয়োগের অজানা জগতে দেখা যায়, একটি অদৃশ্য কোম্পানি যেখানে চেয়ারম্যান এমডিকে চেনেন না, আবার এমডিও জানেন না চেয়ারম্যান কে। অফিসের দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া। বাস্তবে এসব কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ সেইসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে নগদ, যার এক টাকাও আর দেশে ফেরেনি—সব চলে গেছে তৃতীয় দেশে।

দীর্ঘ ৮ বছর ধরে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

গত আট বছরে ধাপে ধাপে এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলে একটি জালিয়াাতির সাম্রাজ্য। গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সরকারের প্রভাবশালী রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন উপ প্রেস সচিবও। অনেকেই এখনো দম্ভের সঙ্গে বহাল আছেন, পড়েননি কোনো আইনি ফাঁদে।

মালিকানা নিয়ে ধোঁয়াশা, আড়ালে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির জাল

২০১৯ সাল পর্যন্ত নগদের মালিকানা নিয়ে ছিল দোলাচল—সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ না বেসরকারি থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস? ২০২১ সালে এই মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও ছিল অস্পষ্টতা। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ের পরই পর্দা সরে, বেরিয়ে আসে নগদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র।

ভুয়া কোম্পানিতে বিনিয়োগ, ২,৩৫৬ কোটি টাকার গরমিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক কমিটির সাম্প্রতিক পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে নগদের ই-মানি ব্যবস্থায় গুরুতর জালিয়াতির তথ্য। অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক মানি তৈরি ও ভুয়া এজেন্ট দেখিয়ে নগদ অন্তত ২,৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব গোপন রেখেছে।

ফিনটেক হোল্ডিংস: নামেই কোম্পানি, বাস্তবে নেই কোনো অস্তিত্ব

নগদের বড় বিনিয়োগ হয় ‘ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড’ নামে এক প্রতিষ্ঠানে, যার ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বই নেই। ভবনের ম্যানেজার পর্যন্ত নাম শুনেছেন প্রথমবার। অথচ সেখানে মোটা অঙ্কের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।

চেয়ারম্যান জানেন না ব্যবসার ধরন, ডিরেক্টর জানেন না কোন কোম্পানিতে আছেন!

ফিনটেকের চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার নিজেই জানেন না তার কোম্পানি কী ব্যবসা করে। এমডির পরিচয়ও জানেন না। ডিরেক্টর সারোয়ার রহমান দিপু বলেন, তিনি জানেন না তিনি কোন কোম্পানির ডিরেক্টর! এসবই প্রমাণ করে দুর্নীতির স্তর কতটা গভীরে গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের মালিকানা

নগদের ৬% শেয়ারধারী ‘ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস’-এর চেয়ারম্যান নাহিম রাজ্জাক, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও সাবেক এমপি। আর ২.৪% শেয়ারধারী ‘তাসিয়া হোল্ডিংস’ নিয়ন্ত্রিত হয় সাবেক পুলিশ কমিশনারের ঘনিষ্ঠজন তানভির মিশুকের মাধ্যমে।

ভুয়া অফিস, খালি চেয়ার আর অতীতের জমজমাট রাজনীতি

তাসিয়া হোল্ডিংসের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় মাত্র দুজন বসে আছেন, বাকি ৩০-৪০টি চেয়ার খালি। ভবনের দারোয়ান জানান, আওয়ামী লীগের আমলে এই অফিস ছিল জমজমাট, বড় বড় নেতা আসতেন নিয়মিত। এখন প্রায় ফাঁকা।

বিদেশি কোম্পানির ছায়ায় শেয়ার মালিকানা

নগদের মোট শেয়ারের ৭০.৫% রয়েছে ‘মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেড’ (ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ)-এর হাতে। বাকি চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শেয়ার ১%-এরও কম। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিদেশি দখলে, যার পেছনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।

৫০০ কোটি টাকার লেনদেন: সন্দেহজনক শেয়ার স্থানান্তর

ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস নামে বাংলাদেশি একটি কোম্পানি ২০২১-২২ সালের মধ্যে নগদে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এর মধ্যে এক মাসের ব্যবধানে ৬২ কোটি টাকার শেয়ার স্থানান্তর করে সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের নামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই লেনদেন সন্দেহজনক।

সারাংশ:
নগদ লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে গত আট বছরে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভুয়া কোম্পানি, অদৃশ্য পরিচালক, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, আর ব্যাংকিং দুর্বলতার সুযোগে তৈরি হয় একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে আসা এই তথ্য দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।

নগদে ২,৩৫৬ কোটি টাকার লোপাট: অদৃশ্য কোম্পানি দিয়ে অর্থপাচার, তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক

আপডেট সময় : ১২:২২:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ মে ২০২৫

নগদের বিনিয়োগের অজানা জগতে দেখা যায়, একটি অদৃশ্য কোম্পানি যেখানে চেয়ারম্যান এমডিকে চেনেন না, আবার এমডিও জানেন না চেয়ারম্যান কে। অফিসের দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া। বাস্তবে এসব কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব নেই। অথচ সেইসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছে নগদ, যার এক টাকাও আর দেশে ফেরেনি—সব চলে গেছে তৃতীয় দেশে।

দীর্ঘ ৮ বছর ধরে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য

গত আট বছরে ধাপে ধাপে এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলে একটি জালিয়াাতির সাম্রাজ্য। গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সরকারের প্রভাবশালী রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন উপ প্রেস সচিবও। অনেকেই এখনো দম্ভের সঙ্গে বহাল আছেন, পড়েননি কোনো আইনি ফাঁদে।

মালিকানা নিয়ে ধোঁয়াশা, আড়ালে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির জাল

২০১৯ সাল পর্যন্ত নগদের মালিকানা নিয়ে ছিল দোলাচল—সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ না বেসরকারি থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস? ২০২১ সালে এই মালিকানা বিরোধ নিষ্পত্তি হলেও ছিল অস্পষ্টতা। তবে আওয়ামী লীগ সরকার বিদায়ের পরই পর্দা সরে, বেরিয়ে আসে নগদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র।

ভুয়া কোম্পানিতে বিনিয়োগ, ২,৩৫৬ কোটি টাকার গরমিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক কমিটির সাম্প্রতিক পরিদর্শনে বেরিয়ে আসে নগদের ই-মানি ব্যবস্থায় গুরুতর জালিয়াতির তথ্য। অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক মানি তৈরি ও ভুয়া এজেন্ট দেখিয়ে নগদ অন্তত ২,৩৫৬ কোটি টাকার হিসাব গোপন রেখেছে।

ফিনটেক হোল্ডিংস: নামেই কোম্পানি, বাস্তবে নেই কোনো অস্তিত্ব

নগদের বড় বিনিয়োগ হয় ‘ফিনটেক হোল্ডিংস লিমিটেড’ নামে এক প্রতিষ্ঠানে, যার ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বই নেই। ভবনের ম্যানেজার পর্যন্ত নাম শুনেছেন প্রথমবার। অথচ সেখানে মোটা অঙ্কের শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।

চেয়ারম্যান জানেন না ব্যবসার ধরন, ডিরেক্টর জানেন না কোন কোম্পানিতে আছেন!

ফিনটেকের চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার নিজেই জানেন না তার কোম্পানি কী ব্যবসা করে। এমডির পরিচয়ও জানেন না। ডিরেক্টর সারোয়ার রহমান দিপু বলেন, তিনি জানেন না তিনি কোন কোম্পানির ডিরেক্টর! এসবই প্রমাণ করে দুর্নীতির স্তর কতটা গভীরে গিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের মালিকানা

নগদের ৬% শেয়ারধারী ‘ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস’-এর চেয়ারম্যান নাহিম রাজ্জাক, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও সাবেক এমপি। আর ২.৪% শেয়ারধারী ‘তাসিয়া হোল্ডিংস’ নিয়ন্ত্রিত হয় সাবেক পুলিশ কমিশনারের ঘনিষ্ঠজন তানভির মিশুকের মাধ্যমে।

ভুয়া অফিস, খালি চেয়ার আর অতীতের জমজমাট রাজনীতি

তাসিয়া হোল্ডিংসের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় মাত্র দুজন বসে আছেন, বাকি ৩০-৪০টি চেয়ার খালি। ভবনের দারোয়ান জানান, আওয়ামী লীগের আমলে এই অফিস ছিল জমজমাট, বড় বড় নেতা আসতেন নিয়মিত। এখন প্রায় ফাঁকা।

বিদেশি কোম্পানির ছায়ায় শেয়ার মালিকানা

নগদের মোট শেয়ারের ৭০.৫% রয়েছে ‘মিরেস হোল্ডিংস লিমিটেড’ (ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ)-এর হাতে। বাকি চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত শেয়ার ১%-এরও কম। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিদেশি দখলে, যার পেছনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ।

৫০০ কোটি টাকার লেনদেন: সন্দেহজনক শেয়ার স্থানান্তর

ক্যান্ডেলস্টোন ইনভেস্টমেন্টস নামে বাংলাদেশি একটি কোম্পানি ২০২১-২২ সালের মধ্যে নগদে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এর মধ্যে এক মাসের ব্যবধানে ৬২ কোটি টাকার শেয়ার স্থানান্তর করে সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের নামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই লেনদেন সন্দেহজনক।

সারাংশ:
নগদ লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে গত আট বছরে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভুয়া কোম্পানি, অদৃশ্য পরিচালক, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, আর ব্যাংকিং দুর্বলতার সুযোগে তৈরি হয় একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে আসা এই তথ্য দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।