ফরিদপুরে ঠিকাদারের ঝুলন্ত মরদেহ, চিরকুটে লেখা বিল্লাল ভাই আমাকে বাঁচতে দিলেন না
- আপডেট সময় : ১২:০২:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ মে ২০২৫
- / 2004
ফরিদপুরে নুরুজ্জামান বুলবুল (৪৮) নামে এক তরুণ ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার (১২ মে) বিকেল ৪টার দিকে সদর উপজেলার কৈজুরি ইউনিয়নের কৈজুরি গ্রামে নিজ পৈত্রিক বাসভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
সুইসাইড নোটে আত্মহত্যার ইঙ্গিত
পুলিশ জানিয়েছে, বুলবুলের কক্ষ থেকে মৃত্যুর আগে লেখা একাধিক সুইসাইড নোট (চিরকুট) উদ্ধার করা হয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা ছিল, “বিল্লাল ভাই আমাকে আর বাঁচতে দিলেন না।” ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়িক বিরোধ ও পারিবারিক জটিলতা থেকেই বুলবুল আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
পরিবারের সদস্যদের বিবরণ
মৃত নুরুজ্জামান বুলবুল কৈজুরি গ্রামের বাসিন্দা মরহুম মোজাফফর হোসেন রাঙা মিয়ার ছোট ছেলে। তার বাবা ফরিদপুরের মুন্সিবাজার এলাকার একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি চার বছর আগে মারা যান। গত বছর বুলবুলের মা-ও মৃত্যুবরণ করেন। স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি পৈত্রিক বাড়িতেই বসবাস করতেন।
কক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পাওয়ার পর ঘটনা প্রকাশ
স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, রোববার দুপুরে বুলবুল তাদের তিনতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার ওই কক্ষে প্রবেশ করেন। দীর্ঘ সময় কোনো সাড়া না পেয়ে সোমবার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা দরজা ভেঙে তার ঝুলন্ত দেহ দেখতে পান এবং পুলিশে খবর দেন।
পুলিশের বক্তব্য
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, “এটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কিছু, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।”
ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও অতীত ইতিহাস
জানা গেছে, নুরুজ্জামান বুলবুল বিভিন্ন সরকারি দফতরে ঠিকাদারির কাজ করতেন। সর্বশেষ তিনি বাগেরহাটে একটি মডেল মসজিদ নির্মাণের বড় একটি প্রকল্প শেষ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুর দিকেই তিনি হাড়কান্দি এলাকার বাসিন্দা এবং জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে ঠিকাদারির ব্যবসায় যুক্ত হন।
বিল্লাল হোসেন ও বুলবুলের যৌথ মালিকানায় মুন্সিবাজার বাইপাস মোড়ে একটি চারতলা ভবন নির্মিত হয়। শুধু ব্যবসায়িক অংশীদার নয়, তাদের সম্পর্ক ছিলো বড়ভাই-ছোটভাইয়ের মতো।
বিল্লালের অতীত ও সম্পর্কের টানাপড়েন
সূত্রে জানা গেছে, বিল্লাল হোসেন সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবরের মুরগির খামারে ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি দুই হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলার আসামি ছিলেন এবং দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান। মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক পতনের পর থেকে বিল্লাল আত্মগোপনে ছিলেন।
এ ঘটনায় বিল্লাল হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইসঙ্গে, বুলবুলের পরিবারের কেউ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পারিবারিক টানাপড়েন ও আরও চিরকুট
জানা গেছে, বুলবুলের তিন মেয়ের মধ্যে মেঝো মেয়ের প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফাহিম আহমেদকে বিয়ে করেন। এই বিষয়সহ আরও কিছু পারিবারিক বিষয় নিয়ে বুলবুল ও তার পরিবারের মধ্যে টানাপড়েন চলছিল।
বুলবুল মৃত্যুর আগে চিরকুটে লিখেছেন, “আল্লাহ পাক যদি আমার মৃত্যু দেন, তাহলে আমার মেয়েরা যেনো আমার মরামুখ না দেখে। আমার কবর যেনো আমার মায়ের কবরের পাশে হয়, এ বাড়িতে নয়।” উল্লেখ্য, গত বছর তার মাকে কৈজুরি ইউনিয়নের মামুদপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছিল।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ফরিদপুরে শোকের ছায়া ফেলেছে। আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।




















