মুক্তমঞ্চে খুন, রমনায় ইয়াবা, কালীমন্দিরে হেরোইন: সোহরাওয়ার্দীতে মাদক রুট
- আপডেট সময় : ০৩:০২:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৫
- / 398
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নগরবাসীর জন্য প্রকৃতির মাঝে কিছুটা স্বস্তির জায়গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো এর পাশে অবস্থিত। পাশাপাশি শাহবাগ থানা হওয়ায় অনেকেই এখানে নিরাপদ বোধ করতেন। কিন্তু পর্যাপ্ত নজরদারি ও তদারকির অভাবে উদ্যানটি মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে পরিণত হয়েছিল।
১৩ মে দিবাগত রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্যের ছুরিকাঘাতের ফলে তার মৃত্যু ঘটে। শাহরিয়ার ছিলেন স্যার এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক। এই হত্যার পর উদ্যানের মাদক সমস্যা ও অপরাধ প্রবণতার অন্ধকার দিক সামনে আসে।
মাদক কারবারের তিন প্রধান চক্র
তদন্তে জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ কেজি গাঁজা বিক্রি হতো। এই ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ করতো তিনটি প্রধান ‘গ্রিপ’ বা চক্র – মেহেদী, পারুলী আক্তার (ওরফে পারুল) ও নবী। প্রতিটি চক্র উদ্যানের নির্দিষ্ট এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করতো। তাদের অধীনে ৮-১০ জন করে বিক্রেতা কাজ করতো। এছাড়াও ফারুক নামের একজন মাদক ব্যবসায়ী ছিল। গাঁজা সাধারণত ছোট ছোট ‘পুরিয়া’ আকারে সাদা কাগজে মুড়িয়ে বিক্রি হতো। গাঁজা ছাড়াও সীমিত পরিমাণে হেরোইন ও ইয়াবাও বিক্রি হত।
অপরাধের জালে উদ্যান
মাদক কারবার ছাড়াও উদ্যানের চারপাশে মোটরসাইকেল চোর ও ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় ছিল। কয়েকটি গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বা ছাত্রসংগঠনের নেতা পরিচয় দিয়ে নগদ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, খুন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল। এই চক্রগুলোর পেছনে রাজনৈতিক আশীর্বাদের কথাও উঠেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে সমালোচনা ও অভিযান
শাহরিয়ার হত্যার পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। সরকারের উদ্যোগে ১৫ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন উদ্যানে উচ্ছেদ অভিযান চালায়। অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
মাদক কারবারের এলাকা ভাগাভাগি
উদ্যানে আগে শুধু চা ও সিগারেটের দোকান থাকলেও ধীরে ধীরে ফাস্টফুড, ফুচকা, চটপটিসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান গড়ে ওঠে, যা জনসমাগম বাড়ায়। মেহেদী দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ নিয়ন্ত্রণ করতেন, যেখানে গাঁজা মুক্তমঞ্চে প্রকাশ্যেই সেবন করা হত। পারুলী উদ্যানের মাঝখানে নিয়ন্ত্রণ করতেন, যাঁর হয়ে বর্তমানে হাসিনা নামের এক নারী গাঁজা বিক্রি করেন। নবী উত্তর-পশ্চিম অংশ দেখভাল করতেন। বিভিন্ন ছোট ছোট চক্র ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত।
মাদক কারবারিদের ‘সুইচ গিয়ার’ ও অস্ত্রসহ উপস্থিতি
মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার এড়াতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে ঝামেলার সময় আত্মরক্ষার জন্য সুইচ গিয়ার (চাকু) ও টেজার (ইলেকট্রিক শক স্টানগান) সঙ্গে রাখেন। হত্যার তদন্তে জানা যায়, এই অস্ত্রগুলি প্রায়শই ব্যবহার করা হয়। এক কর্মচারীর ছেলেকে মারধরের ঘটনাতেও মেহেদী ও সহযোগীরা জড়িত ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত
১৩ মে রাত ১২টার দিকে মুক্তমঞ্চের পাশে শাহরিয়ার ও তাঁর দুই বন্ধু রাফি ও বায়েজিদ মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে মেহেদী গ্রুপের সদস্যরা তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে টেজার দিয়ে আঘাত করা হয়, পরে শাহরিয়ার থামানোর চেষ্টা করলে সুইচ গিয়ারে তাঁর উরুতে আঘাত করা হয়। এরপর মাদকসেবীদের এক গ্রুপও হামলায় অংশ নেয়। ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় সাদা পোশাকধারী এক ব্যক্তির মোটরসাইকেল।
তদন্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া
এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ডিবির যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানান, হত্যার সঙ্গে উদ্যানের অপরাধ প্রবণতাসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমদ খানের সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই পুলিশের প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
সংক্ষেপে
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মাদক কারবার, ছিনতাই, হ্যারাসমেন্টসহ নানা অপরাধের গুমোটেই ধুঁকছে। শাহরিয়ার আলম সাম্যের নির্মম হত্যাকাণ্ড এ অঞ্চলের নিরাপত্তার চিত্র আরও অন্ধকার করে তুলেছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও, গভীরভাবে উদ্যানের অপরাধ জগৎ মোকাবিলার জন্য তৎপরতা প্রয়োজন।


























