ইরানে শাসন পরিবর্তনের ডাক: যুক্তরাষ্ট্রের অতীত অভিশাপ, জন্ম তীব্র মার্কিন-বিরোধিতার
- আপডেট সময় : ০৯:৪৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ জুন ২০২৫
- / 392
ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই দেশটিতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ডাক আরও জোরালো হচ্ছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ইরানিদের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়; বরং তা তাদের কাছে চরম কষ্টের স্মৃতি হয়ে আছে।
এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বারবার বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে।
১৯৫৩ সালের অভিশপ্ত অভ্যুত্থান: তেলের রাজনীতি ও স্নায়ুযুদ্ধ
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৫৩ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে সরাতে একটি অভ্যুত্থানে সরাসরি সহায়তা করে। মোসাদ্দেকের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের তেলক্ষেত্রগুলো জাতীয়করণ করা। এই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তেল জাতীয়করণের এই উদ্যোগ ইরানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এটি ছিল এক প্রতীকী বিজয়, যা স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।
শাহের ক্ষমতা সুদৃঢ়করণ ও সিআইএ’র গোপন তৎপরতা
এই অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতায় রাখা এবং জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। অভ্যুত্থানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ (Central Intelligence Agency) এবং ব্রিটিশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (SIS) যৌথভাবে মোসাদ্দেকবিরোধী মনোভাব উসকে দিতে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ১৯৫৩ সালে সিআইএ এবং এসআইএস প্রো-শাহ শক্তিকে সংগঠিত করে এবং মোসাদ্দেকবিরোধী বড় বড় বিক্ষোভের আয়োজন করে, যেখানে পরে সেনাবাহিনীও যোগ দেয়।
অভ্যুত্থানের মাত্র দু’দিনের মধ্যেই সিআইএ গোপনে ৫০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেয় নতুন প্রধানমন্ত্রী জাহেদির শাসনকে স্থিতিশীল করতে – এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত নথি থেকে জানা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকারোক্তি ও বুমেরাং প্রভাব
২০১৩ সালে গোপনীয়তা মুক্ত হওয়া সিআইএ’র নথিপত্র প্রথমবারের মতো এই অভ্যুত্থানে সংস্থাটির সরাসরি ভূমিকার কথা নিশ্চিত করে। যদিও বিষয়টি আগে থেকেই অনেকটা জানা ছিল, ২০০৯ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিজেও এই অভ্যুত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
মোসাদ্দেককে সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র শাহ পাহলভিকে শক্তভাবে সমর্থন করে। কিন্তু এই বিদেশি হস্তক্ষেপ ইরানিদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা ভবিষ্যতে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদে এক মারাত্মক মার্কিনবিরোধী মনোভাবের জন্ম দেয়।
ইসলামি বিপ্লব: শাহের পতন ও নতুন শাসনের সূচনা
শাহ ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে কোটি কোটি ইরানি তার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামে। ধর্মনিরপেক্ষ বিক্ষোভকারীরা তার স্বৈরাচারিতা এবং ইসলামপন্থীরা তার পাশ্চাত্যঘেঁষা সংস্কার এজেন্ডার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
অবশেষে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে শাহের পতন ঘটে। এর মাধ্যমে পশ্চিমা-সমর্থিত রাজতন্ত্রের অবসান হয় এবং ইরানে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ধর্মীয় শাসনের সূচনা হয়। এই বিপ্লবই ইরানে আজকের রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অতীতের হস্তক্ষেপেরই এক জটিল প্রতিক্রিয়া।

























