ঢাকা ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭৫ সদস্যের ‘ফ্যামিলি কমিটি’: ইসি কি জানে, সেক্রেটারি সাহেবাই দলের সব?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:১১:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫
  • / 382

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা অনেক নতুন দলের কার্যালয়ের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আবেদনপত্রে দেওয়া ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এসব দলের কার্যালয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রধানের বাসাবাড়িই দেখানো হয়েছে ‘প্রধান কার্যালয়’ হিসেবে। এটি নিবন্ধনের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত রবিবার (২২ জুন, ২০২৫) পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের শেষ দিনে মোট ১৪৭টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, যার মধ্যে শেষ দিনেই আবেদন জমা পড়েছে ৪২টি। এর আগে, গত ১০ মার্চ আগ্রহী নতুন দলের কাছ থেকে নিবন্ধনের আবেদন আহ্বান করে ইসি, এবং ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫টি দল আবেদন করে। পরে কিছু দলের অনুরোধে সময়সীমা বাড়িয়ে ২২ জুন পর্যন্ত করা হয়, যেখানে আরও ৮২টি আবেদন জমা পড়ে।

‘বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি’: সভাপতির বাসা, স্ত্রী সাধারণ সম্পাদক!

নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ‘বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি’। আবেদনে দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে ৬৩৯/বি, পেয়ারাবাগ, মগবাজার, ঢাকা। মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকেলে ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, পলেস্তারা খসে যাওয়া দেয়াল ও ওপরে টিনের ছাউনি দেওয়া এক কক্ষের একটি ঘর।

ঘরে কেউ আছেন কি না, কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া মেলেনি। পরে দল নিবন্ধনের আবেদনে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া দলটির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হাওলাদারের মুঠোফোন নম্বরে কল করলে তার স্ত্রী ** মাহমুদা সুলতানা** ধরেন। তিনি জানান, জাহাঙ্গীর হাওলাদার বাসায় আছেন। এরপর গামছা জড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসেন বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি।

আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হাওলাদার জানান, ২০১১ সালে তিতুমীর কলেজে পড়ার সময় তিনি পার্টি গঠন করেছেন। তিনি বলেন, “এখানে অফিস নেব, চিন্তা করছি আরকি। আগে দলটল ঠিক অইলে এর পরে নেব আরকি।” দলের কমিটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ৭৫ সদস্যের কমিটি আছে, যেখানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের লোকজন আছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তার স্ত্রী মাহমুদা সুলতানা বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সেক্রেটারি।

দলের কার্যালয়ের বিষয়ে জাহাঙ্গীর হাওলাদার আশাবাদ ব্যক্ত করেন, “পর্যায়ক্রমে সবকিছু হবে, কোনো কিছু বাদ থাকবে না। নিবন্ধন অইলে একটা একটা করে হতে থাকবে। মানে কোনো কিছু বাদ থাকবে না, আল্লাহর রহমতে যদি হয় নিবন্ধন। আপনারা একটু পাশে থাইকেন।”

অন্যান্য দলেরও একই চিত্র

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা আরও কয়েকটি দলের কার্যালয়ের ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়েও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে:

‘মুসলিম সেইভ ইউনিয়ন’: দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে রমজান ট্রেডিং ৮৩ (৩য় ও ৪র্থ তলা), লেন নং-২, শান্তিনগর বাজার, ঢাকা। তবে ওই ঠিকানায় গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দলটির সভাপতি আবদুল মান্নান মিয়া মুঠোফোনে জানান, এখন তার কার্যালয় ওই ঠিকানায় নেই এবং মালিবাগের প্রশান্তি হাসপাতালের পাশে একটি ভবনে রয়েছে, তবে সেটি এখন বন্ধ। তিনি স্পষ্ট ঠিকানা দিতে রাজি হননি।
‘বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি’: দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, নর্দান ইউনিভার্সিটি বিল্ডিং (লিফট-১২)। এখানেও কোনো কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভবনের ১২ তলায় কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় দেখা যায়, কিন্তু ‘বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি’ নামে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আছে বলে মো. সাব্বির নামের একজন অভ্যর্থনাকারী জানাতে পারেননি।
‘মুক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন’: আবেদনে দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে ৩৯০ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, বাংলামোটর, ঢাকা। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর এই ঠিকানায় একটি পুরোনো আবাসিক ভবন পাওয়া যায়, যেখানে কোনো দলীয় কার্যালয় ছিল না। ভাড়াটেরা এমন কোনো দলের নামই শোনেননি বলে জানিয়েছেন।

এছাড়া, ‘বাংলাদেশ মাতৃভূমি দল’, ‘জনতার কথা বলে’ ও ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ নামের কয়েকটি দলের কার্যালয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের ভেতরে কক্ষের সামনে সাইনবোর্ড সাঁটানো পাওয়া যায়। তবে কক্ষগুলো ছিল বন্ধ।

নির্বাচন কমিশন এই দলগুলোর আবেদন কীভাবে যাচাই-বাছাই করবে এবং নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না করেও এমন অস্তিত্বহীন দলগুলো কীভাবে আবেদন করতে পারল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

৭৫ সদস্যের ‘ফ্যামিলি কমিটি’: ইসি কি জানে, সেক্রেটারি সাহেবাই দলের সব?

আপডেট সময় : ১২:১১:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ জুন ২০২৫

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা অনেক নতুন দলের কার্যালয়ের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, আবেদনপত্রে দেওয়া ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এসব দলের কার্যালয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রধানের বাসাবাড়িই দেখানো হয়েছে ‘প্রধান কার্যালয়’ হিসেবে। এটি নিবন্ধনের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

গত রবিবার (২২ জুন, ২০২৫) পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপের শেষ দিনে মোট ১৪৭টি দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, যার মধ্যে শেষ দিনেই আবেদন জমা পড়েছে ৪২টি। এর আগে, গত ১০ মার্চ আগ্রহী নতুন দলের কাছ থেকে নিবন্ধনের আবেদন আহ্বান করে ইসি, এবং ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৫টি দল আবেদন করে। পরে কিছু দলের অনুরোধে সময়সীমা বাড়িয়ে ২২ জুন পর্যন্ত করা হয়, যেখানে আরও ৮২টি আবেদন জমা পড়ে।

‘বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি’: সভাপতির বাসা, স্ত্রী সাধারণ সম্পাদক!

নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ‘বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি’। আবেদনে দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে ৬৩৯/বি, পেয়ারাবাগ, মগবাজার, ঢাকা। মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকেলে ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, পলেস্তারা খসে যাওয়া দেয়াল ও ওপরে টিনের ছাউনি দেওয়া এক কক্ষের একটি ঘর।

ঘরে কেউ আছেন কি না, কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া মেলেনি। পরে দল নিবন্ধনের আবেদনে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া দলটির সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হাওলাদারের মুঠোফোন নম্বরে কল করলে তার স্ত্রী ** মাহমুদা সুলতানা** ধরেন। তিনি জানান, জাহাঙ্গীর হাওলাদার বাসায় আছেন। এরপর গামছা জড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসেন বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি।

আবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হাওলাদার জানান, ২০১১ সালে তিতুমীর কলেজে পড়ার সময় তিনি পার্টি গঠন করেছেন। তিনি বলেন, “এখানে অফিস নেব, চিন্তা করছি আরকি। আগে দলটল ঠিক অইলে এর পরে নেব আরকি।” দলের কমিটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ৭৫ সদস্যের কমিটি আছে, যেখানে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের লোকজন আছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তার স্ত্রী মাহমুদা সুলতানা বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সেক্রেটারি।

দলের কার্যালয়ের বিষয়ে জাহাঙ্গীর হাওলাদার আশাবাদ ব্যক্ত করেন, “পর্যায়ক্রমে সবকিছু হবে, কোনো কিছু বাদ থাকবে না। নিবন্ধন অইলে একটা একটা করে হতে থাকবে। মানে কোনো কিছু বাদ থাকবে না, আল্লাহর রহমতে যদি হয় নিবন্ধন। আপনারা একটু পাশে থাইকেন।”

অন্যান্য দলেরও একই চিত্র

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা আরও কয়েকটি দলের কার্যালয়ের ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়েও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে:

‘মুসলিম সেইভ ইউনিয়ন’: দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে রমজান ট্রেডিং ৮৩ (৩য় ও ৪র্থ তলা), লেন নং-২, শান্তিনগর বাজার, ঢাকা। তবে ওই ঠিকানায় গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দলটির সভাপতি আবদুল মান্নান মিয়া মুঠোফোনে জানান, এখন তার কার্যালয় ওই ঠিকানায় নেই এবং মালিবাগের প্রশান্তি হাসপাতালের পাশে একটি ভবনে রয়েছে, তবে সেটি এখন বন্ধ। তিনি স্পষ্ট ঠিকানা দিতে রাজি হননি।
‘বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি’: দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, নর্দান ইউনিভার্সিটি বিল্ডিং (লিফট-১২)। এখানেও কোনো কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। ভবনের ১২ তলায় কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় দেখা যায়, কিন্তু ‘বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি’ নামে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আছে বলে মো. সাব্বির নামের একজন অভ্যর্থনাকারী জানাতে পারেননি।
‘মুক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন’: আবেদনে দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া আছে ৩৯০ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, হাতিরপুল, বাংলামোটর, ঢাকা। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর এই ঠিকানায় একটি পুরোনো আবাসিক ভবন পাওয়া যায়, যেখানে কোনো দলীয় কার্যালয় ছিল না। ভাড়াটেরা এমন কোনো দলের নামই শোনেননি বলে জানিয়েছেন।

এছাড়া, ‘বাংলাদেশ মাতৃভূমি দল’, ‘জনতার কথা বলে’ ও ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ নামের কয়েকটি দলের কার্যালয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের ভেতরে কক্ষের সামনে সাইনবোর্ড সাঁটানো পাওয়া যায়। তবে কক্ষগুলো ছিল বন্ধ।

নির্বাচন কমিশন এই দলগুলোর আবেদন কীভাবে যাচাই-বাছাই করবে এবং নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না করেও এমন অস্তিত্বহীন দলগুলো কীভাবে আবেদন করতে পারল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।