দিল্লি-ঢাকা থেকে একই হুঙ্কার: নির্বাচনে ‘হঠাৎ আক্রমণ’ ষড়যন্ত্র
- আপডেট সময় : ১২:৫২:১৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৭ নভেম্বর ২০২৫
- / 442
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনীতিতে রহস্যময় মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে নির্বাচন ঠেকানোর জন্য অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে কঠোর কর্মসূচির হুমকি দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার ২৯ অক্টোবরের ‘নির্বাচন বানচালের বড় শক্তি’ কাজ করার আশঙ্কার সঙ্গে এই দুই পক্ষের হুমকির যোগসূত্র খুঁজছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নির্বাচন বানচালের এই ষড়যন্ত্রে জামায়াতকে ‘খুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
হুমকির পাল্টাপাল্টি: দিল্লি বনাম ঢাকা
শেখ হাসিনা (দিল্লি): পলাতক হাসিনা দিল্লি থেকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ভোট ঠেকানোর জন্য আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ।
জামায়াত (ঢাকা): দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঁচ দফা দাবিতে স্মারকলিপি দিয়ে ১১ নভেম্বরের মধ্যে দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
নায়েবে আমিরের হুঙ্কার: নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুমকি দিয়ে বলেছেন, “সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে, আঙুল বাঁকা করব; ঘি আমাদের লাগবেই।” তাঁর বক্তব্য, নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।
প্রধান উপদেষ্টার ‘আশঙ্কা’ ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
জামায়াত নেতাদের এই হুমকি প্রধান উপদেষ্টার ২৯ অক্টোবরের বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। প্রধান উপদেষ্টা সে সময় বলেছিলেন:
“নির্বাচন বানচালের জন্য ভেতর থেকে, বাইরে থেকে অনেক শক্তি কাজ করবে… হঠাৎ করে আক্রমণ চলে আসতে পারে।”
অনেকের প্রশ্ন, বিদেশ থেকে হাসিনার ষড়যন্ত্র এবং দেশের ভেতর জামায়াতের হুমকি কি সেই ‘হঠাৎ আক্রমণ’ আশঙ্কারই ইঙ্গিত?
বিএনপি’র প্রতিক্রিয়া: হুঁশিয়ারি ও সতর্কতা
দেশের মূল বিরোধী দল বিএনপি এই পরিস্থিতিতে চরম সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন: তিনি অভিযোগ করেন, “দেশে কিছু ব্যক্তি নন-ইস্যুকে ইস্যু বানিয়ে নির্বাচনকে বিলম্বিত বা বাতিল করার ষড়যন্ত্র করছেন।”
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (হুঁশিয়ারি): বিএনপি মহাসচিব নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্রে যুক্ত দলগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আপনারা মনে রাখবেন, বিএনপি কোনো ভেসে আসা দল নয়। পানি ঘোলা করবেন না। আপনারা দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবেন না।”
রহস্যের সূত্র: জামায়াতের খুঁটির জোর কোথায়?
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এবং সীমিত জনসমর্থিত জামায়াতের মতো একটি দলের হঠাৎ করে গণভোট ও সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে এমন কঠোর হুমকি দেওয়ার নেপথ্যের রহস্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াসহ সব মহলে বিতর্ক চলছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার মন্তব্য: কেউ লিখছেন, “জামায়াতের খুঁটির জোর ভারত”; আবার কেউ মন্তব্য করেছেন, “জামায়াতের খুঁটির শক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরেই রয়ে গেছে।”
আইন উপদেষ্টার ভূমিকা: সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল রাজনৈতিক দলগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে এক সপ্তাহের মধ্যে গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার আহ্বান জানালে এই বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ: ক্ষমতায় দীর্ঘায়িত থাকার বাসনা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা. জাহিদ উর রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকায় তীব্র সমালোচনা করেছেন।
অপরাজনীতি: তাঁর অভিযোগ, “অন্তর্বর্তী সরকার অপরাজনীতি করছে… মনে হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতকে আন্দোলনে নামিয়েছে।”
চাপে ফেলার কৌশল: তাঁর মতে, গণভোটের দাবি আসলে বিএনপিকে চাপে ফেলার একটি কৌশল। জামায়াত আন্দোলন করবে এবং সরকার পরে বিএনপিকে গণভোটের দাবি বাদ দিতে বলে অন্য দাবি মানতে বলবে।
সুদান পরিস্থিতি: বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, জামায়াতের মতো দলগুলোকে এমন গুরুত্ব দিয়ে রাজপথে নামানো হলে বাংলাদেশ সুদানের মতো গৃহযুদ্ধের পরিণতির দিকে যেতে পারে, যেখানে ইসলামপন্থি দলগুলোকেই বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী করা হয়।
সারাদেশ যখন নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সচলতা চাইছে, তখন এই হুমকিগুলো নির্বাচনের আবহকে ম্লান করে দিয়েছে।


























