ঢাকা ০৩:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামছে নারকোটিক্স

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:১৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
  • / 46

দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার বড় ধরনের অ্যাকশনে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে যাচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (নারকোটিক্স) কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। অস্ত্র হাতে আসামাত্রই নতুন শক্তি নিয়ে মাঠে নামবেন তারা। তবে এবারের লক্ষ্য শুধু মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতারা নন, আড়ালে থাকা বড় বড় গডফাদারদেরও জালের আওতায় আনা হবে।

অবশ্য এই উদ্যোগের সফলতা নিয়ে সাধারণ পাঠক ও বিশ্লেষকদের মনে কিছু সংশয়ও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরও স্পষ্ট হতে হবে। কারণ অতীতে সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে, বড় বড় মাদক গডফাদাররা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে পার পেয়ে গেছে।

ঝুঁকি এড়াতে অস্ত্র হাতে মাঠে:

মাঠপর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে গিয়ে নারকোটিক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায়ই মারাত্মক হামলার শিকার হন। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে অভিযানে গিয়ে একজন পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন এবং বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আহত হন। এই চরম ঝুঁকি বিবেচনা করেই সরকার নারকোটিক্সের জন্য স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমোদন দেয়।

পুলিশের সহায়তায় ইতোমধ্যে সারদা পুলিশ একাডেমিতে অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) থেকে শুরু করে উপপরিচালক পদমর্যাদার প্রায় চারশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অস্ত্র চালনাসহ স্বল্পমেয়াদি বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু অস্ত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।

আসছে ডগ স্কোয়াড ও সাইবার ইউনিট:

মাদক পাচার প্রতিরোধে নারকোটিক্সের সক্ষমতা বাড়াতে ডগ স্কোয়াড, সাইবার ইউনিট, অর্থ পাচার ইউনিট এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবসহ বিশাল জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে সৌদি আরবগামী কিছু বাংলাদেশির কাছ থেকে ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর সৌদি সরকার উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকাতে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠির সূত্র ধরে বিমানবন্দরসহ দেশের সব বন্দরে মাদক চোরাচালান রুখতে নারকোটিক্সকে ‘লিড এজেন্সি’ বা প্রধান সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। বন্দরে মাদকের চালান শনাক্তে বিশেষায়িত ডগ স্কোয়াড ও উচ্চ প্রযুক্তির স্ক্যানার বসানো হচ্ছে।

পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার জগৎ মাদক বেচাকেনার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমনকি ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদকের লেনদেন হচ্ছে। এটি রুখতে নারকোটিক্সে ৭৭ জনের একটি বিশেষায়িত সাইবার ক্রাইম সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

গুগলের সাথে চুক্তি ও অর্থ পাচার মামলা:

মাদক নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সরাসরি সহায়তা নিতে যাচ্ছে নারকোটিক্স। গুগলের সাথে একটি সফল বৈঠকের পর ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। নারী ও শিশু পাচারের মতো গুগল এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের তথ্য জাতিসংঘের মাদকবিরোধী সংস্থার (আইএনসিবি) মাধ্যমে নারকোটিক্সকে পাঠাবে।

এছাড়া, মাদক গডফাদারদের কাবু করতে প্রচলিত মাদক আইনের পাশাপাশি অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) আইনে মামলার জোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুই ডজনেরও বেশি অর্থ পাচার মামলা করা হয়েছে।

মামলাজট কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল:

বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার মাদক মামলা ঝুলে আছে। দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর অভাবে তৈরি হওয়া এই জট কমাতে আইন মন্ত্রণালয় পৃথক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো সরাসরি নিজেদের কার্যালয়ে মামলা রেকর্ড করার ক্ষমতাও দাবি করছেন। একই সাথে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নতুন করে প্রায় ৯ হাজার জনবল কাঠামোর একটি বড় প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সর্ষের মধ্যে ভূত তাড়ানোর তাগিদ:

তবে নারকোটিক্সের সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, আধুনিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র দিলেও আসল কাজ কিছুই হবে না যদি ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ থাকে। এই সেক্টরে কাঁচা টাকার ছড়াছড়ি থাকায় কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় মাদকের বিস্তার ঘটে। তাই কর্মকর্তাদের সবার আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং অবৈধ অর্থ পকেটে না ঢোকানোর শপথ নিতে হবে, নতুবা বাইরে থেকে জোর করে কোনো লাভ হবে না।

মাদক সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামছে নারকোটিক্স

আপডেট সময় : ১২:১৬:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবার বড় ধরনের অ্যাকশনে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে খুব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে যাচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (নারকোটিক্স) কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। অস্ত্র হাতে আসামাত্রই নতুন শক্তি নিয়ে মাঠে নামবেন তারা। তবে এবারের লক্ষ্য শুধু মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতারা নন, আড়ালে থাকা বড় বড় গডফাদারদেরও জালের আওতায় আনা হবে।

অবশ্য এই উদ্যোগের সফলতা নিয়ে সাধারণ পাঠক ও বিশ্লেষকদের মনে কিছু সংশয়ও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরও স্পষ্ট হতে হবে। কারণ অতীতে সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে, বড় বড় মাদক গডফাদাররা কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে পার পেয়ে গেছে।

ঝুঁকি এড়াতে অস্ত্র হাতে মাঠে:

মাঠপর্যায়ে মাদকের বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে গিয়ে নারকোটিক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায়ই মারাত্মক হামলার শিকার হন। সম্প্রতি রাজধানীর মগবাজারে অভিযানে গিয়ে একজন পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন এবং বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আহত হন। এই চরম ঝুঁকি বিবেচনা করেই সরকার নারকোটিক্সের জন্য স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমোদন দেয়।

পুলিশের সহায়তায় ইতোমধ্যে সারদা পুলিশ একাডেমিতে অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) থেকে শুরু করে উপপরিচালক পদমর্যাদার প্রায় চারশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অস্ত্র চালনাসহ স্বল্পমেয়াদি বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু অস্ত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষা।

আসছে ডগ স্কোয়াড ও সাইবার ইউনিট:

মাদক পাচার প্রতিরোধে নারকোটিক্সের সক্ষমতা বাড়াতে ডগ স্কোয়াড, সাইবার ইউনিট, অর্থ পাচার ইউনিট এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবসহ বিশাল জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে সৌদি আরবগামী কিছু বাংলাদেশির কাছ থেকে ইয়াবার চালান ধরা পড়ার পর সৌদি সরকার উদ্বেগ জানিয়ে ঢাকাতে চিঠি দিয়েছিল। সেই চিঠির সূত্র ধরে বিমানবন্দরসহ দেশের সব বন্দরে মাদক চোরাচালান রুখতে নারকোটিক্সকে ‘লিড এজেন্সি’ বা প্রধান সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। বন্দরে মাদকের চালান শনাক্তে বিশেষায়িত ডগ স্কোয়াড ও উচ্চ প্রযুক্তির স্ক্যানার বসানো হচ্ছে।

পাশাপাশি, বর্তমান সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সাইবার জগৎ মাদক বেচাকেনার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এমনকি ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মাদকের লেনদেন হচ্ছে। এটি রুখতে নারকোটিক্সে ৭৭ জনের একটি বিশেষায়িত সাইবার ক্রাইম সেল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

গুগলের সাথে চুক্তি ও অর্থ পাচার মামলা:

মাদক নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলের সরাসরি সহায়তা নিতে যাচ্ছে নারকোটিক্স। গুগলের সাথে একটি সফল বৈঠকের পর ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। নারী ও শিশু পাচারের মতো গুগল এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের তথ্য জাতিসংঘের মাদকবিরোধী সংস্থার (আইএনসিবি) মাধ্যমে নারকোটিক্সকে পাঠাবে।

এছাড়া, মাদক গডফাদারদের কাবু করতে প্রচলিত মাদক আইনের পাশাপাশি অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) আইনে মামলার জোর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দুই ডজনেরও বেশি অর্থ পাচার মামলা করা হয়েছে।

মামলাজট কমাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল:

বর্তমানে সারা দেশে বিভিন্ন আদালতে প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার মাদক মামলা ঝুলে আছে। দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর অভাবে তৈরি হওয়া এই জট কমাতে আইন মন্ত্রণালয় পৃথক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মতো সরাসরি নিজেদের কার্যালয়ে মামলা রেকর্ড করার ক্ষমতাও দাবি করছেন। একই সাথে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে নতুন করে প্রায় ৯ হাজার জনবল কাঠামোর একটি বড় প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সর্ষের মধ্যে ভূত তাড়ানোর তাগিদ:

তবে নারকোটিক্সের সাবেক ও বর্তমান কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, আধুনিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র দিলেও আসল কাজ কিছুই হবে না যদি ‘সর্ষের মধ্যে ভূত’ থাকে। এই সেক্টরে কাঁচা টাকার ছড়াছড়ি থাকায় কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় মাদকের বিস্তার ঘটে। তাই কর্মকর্তাদের সবার আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং অবৈধ অর্থ পকেটে না ঢোকানোর শপথ নিতে হবে, নতুবা বাইরে থেকে জোর করে কোনো লাভ হবে না।