৭ বছরে পতিতাবৃত্তি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন হাজার হাজার কর্মী
- আপডেট সময় : ০৫:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
- / 56
বিদেশে গৃহকর্মী হিসেবে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখিয়ে সৌদি আরবে নেওয়া অনেক বাংলাদেশি নারীকে একটি ছদ্মবেশী ‘টিস্যু কোম্পানি’র নামে পতিতাবৃত্তিতে ঠেলে দেওয়ার লোমহর্ষক অভিযোগ উঠেছে। দালাল চক্রের মাধ্যমে সংঘটিত এই আন্তর্জাতিক মানব পাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে গত সাত বছরে প্রায় ৮০ হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন, যা দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করেছে।
করোনায় স্বামী হারানো শিউলি (ছদ্মনাম) নামের এক নারী ২০২৫ সালে সংসারের হাল ধরতে সৌদি আরব যান। সেখানে মূল মালিকের নির্যাতন থেকে বাঁচতে চাকরি পরিবর্তনের চেষ্টা করলে দালালেরা তাকে একটি টিস্যু কোম্পানিতে কাজের প্রলোভন দেখায়। কিন্তু পরে তাকে একটি কক্ষে আটকে রেখে জোরপূর্বক যৌন কাজে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগী শিউলির মুখে অমানবিকতার বিবরণ:
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ভুক্তভোগী শিউলি জানান, একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে তাকে দিনরাত মারধর করা হতো এবং ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। সারাদিন জোরপূর্বক কাজ করানোর পাশাপাশি চলত অমানবিক যৌন নির্যাতন। অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। একাধিক স্থানে ক্রমাগত যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে একপর্যায়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে পাঁচ মাস সৌদি আরবের কারাগারে থাকার পর কোনোমতে দেশে ফিরে তিনি সন্তান জন্ম দেন।
ফিরে আসার ভয়াবহ পরিসংখ্যান:
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক (BRAC) জানিয়েছে, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন, যাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনোভাবে মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার। একই সময়ে অন্তত ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকেই প্রায় ২ হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে ৮০টি দেশ থেকে প্রায় ৭৪ হাজার পুরুষ কর্মীও ফেরত আসেন, যাদের বেশিরভাগই অবৈধভাবে গিয়েছিলেন। এছাড়া, চলতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত আরও প্রায় ২৪ হাজার কর্মী দেশে ফিরেছেন, যার মধ্যে পুরুষ কর্মীর সংখ্যাই ২৩ হাজারের বেশি।
বিশেষজ্ঞ ও সরকারি বক্তব্য:
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান বলেন, “বিদেশে পাঠানোর আগে নারী কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সঠিক বাছাই প্রক্রিয়া জরুরি। পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার হয়ে যারা দেশে ফিরছেন, তারা যেন আইনি বিচার পান তা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।”
এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব ও ওমানসহ কয়েকটি দেশে লিগ্যাল ফার্মের (Legal Firm) সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ফলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টিস্যু কোম্পানির মতো ছদ্মবেশী চক্রগুলো শুধু মানবিক বিপর্যয়ই তৈরি করছে না, বরং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে দালাল চক্র দমন, নিরাপদ অভিবাসন এবং বিদেশে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।





















