ফরিদপুর মেডিকেলে সিজারের পর পেটে গজ: মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নার্স বিথী
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 412
মা হওয়ার যে স্বর্গীয় আনন্দ নিয়ে হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষে ঢুকেছিলেন তিনি, চিকিৎসকদের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অবহেলায় সেই মুহূর্তটাই জীবন-মৃত্যুর বিভীষিকাময় ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিজারিয়ান অপারেশনের সময় পেটের ভেতরেই ফেলে রাখা হয়েছিল ব্যবহৃত গজ (মব)। আর সেই ভুলেই ভেতরে ইনফেকশন ছড়িয়ে পচে গেছে পেটের নাড়ি! চার মাস ধরে লাগাতার যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে শরীর ভেঙে পড়েছে, ৬১ কেজির ওজন নেমে এসেছে মাত্র ৩৯ কেজিতে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের এমন পৈশাচিক গাফিলতির শিকার হয়ে এখন হাসপাতালের সিসিইউতে (CCU) জীবন-মৃত্যুর মাঝকান্দায় দিন গুনছেন বিথী আক্তার নামের এক শিক্ষানবিশ নার্স।
ফরিদপুর ইন্টারন্যাশনাল নার্সিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি সম্পন্ন করা বিথী নিজে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত থেকেও রেহাই পাননি অপচিকিৎসার হাত থেকে। দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকায় তাঁর ইন্টার্নশিপ ও লাইসেন্স পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সিজারের নামে পেটে গজ রেখে সেলাই, ২ মাস পর বাইপাস সার্জারি
ভুক্তভোগী পরিবার ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. তামান্না ও ডা. অরবিন্দের যৌথ তত্ত্বাবধানে বিথীর সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার বদলে শুরু হয় তীব্র পেটের ব্যথা ও একের পর এক শারীরিক জটিলতা। দিনের পর দিন কষ্ট সহ্য করার পর অবস্থার চরম অবনতি হলে প্রায় দুই মাস পর আবারও অস্ত্রোপচারের টেবিলমুখী হতে হয় তাকে। আর তখনই ফাঁস হয় চাঞ্চল্যকর তথ্য—পেটের ভেতরে রেখে দেওয়া হয়েছে গজ বা মব!
পেটের নাড়ি পচে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে করতে হয় জরুরি বাইপাস সার্জারি। কিন্তু এতেও নিস্তার মেলেনি। চার মাস পার হলেও সুস্থ হওয়ার বদলে বিথী আক্তার এখন হার্টের জটিলতাসহ নানা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে তাঁকে পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার বা একটু দুধ খাওয়ানোর সুযোগটুকুও পাননি এই দুর্ভাগা মা।
হাসপাতালের সিসিইউ শয্যায় শুয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বিথী আক্তার বলেন—
“আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়ালেখা করিয়েছেন। আজ আমার পুরো জীবনটাই অনিশ্চিত। অপারেশনের পর পেটে গজ থেকে যাওয়ায় নাড়ি পচে যায়। চিকিৎসকদের অবহেলার কথা বলতে গেলে তারা আমার হাতে মাত্র ৫ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে—‘ভুল তো হয়েই গেছে, এমন ভুল তোমার কাছ থেকেও তো হতে পারতো!’ এভাবে তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চেয়েছে। আমি নিজে নার্স হয়েও যদি এমন অবহেলার শিকার হই, তবে সাধারণ রোগীদের কী অবস্থা হবে? আমি বাঁচব কি না জানি না, আমার নিষ্পাপ শিশুটার কী হবে?”
ঢাকায় ডক্টর, অধরা পরিচালক: ক্ষোভ স্বজনদের
ঘটনার তদন্তে ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রধান অভিযুক্ত ডক্টর তামান্না গত এক মাস ধরে ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ের অজুহাতে ঢাকায় অবস্থান করছেন। আর অবহেলার মতো এই গুরুতর অপরাধে বিচার দাবি করে চিকিৎসকদের পেছনে ঘুরেও পাননি কোনো সুরাহা। ভুক্তভোগীর স্বামী রাকিবুল ইসলামসহ পরিবারের সদস্যরা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ী চিকিৎসকদের কঠোর সাজার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে এত বড় চাঞ্চল্যকর ঘটনা এবং সিসিইউতে এক রোগীর জীবনসংশয়ের বিষয়ে জানতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য বা সাড়া পাওয়া যায়নি।











