ঢাকা ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন বান্ধবীর আর্তনাদ: কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 75

শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই মহাশোকে রূপ নেওয়ার এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কলকাতায়। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপে প্রবল বৃষ্টির জেরে সৃষ্টি হওয়া চরম ভিড় ও হুড়োহুড়ির মাঝে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বহু দর্শনার্থী, যাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।

সপ্তমীর সন্ধ্যায় বৃষ্টির হানাদারি ও হুড়োহুড়ি

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড় ছিল। এর মাঝেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে মণ্ডপের মুখে ও প্রবেশপথগুলোতে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি চরমে ওঠে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বহু মানুষ একযোগে মণ্ডপের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা দিয়ে জানান, তিনি তাঁর তিন বান্ধবীকে নিয়ে মণ্ডপ থেকে বের হওয়ার সময় পিছন থেকে প্রবল ধাক্কা আসে। মুহূর্তের মধ্যে সামনের সারির মানুষগুলো ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান এবং তাঁদের ওপর আছড়ে পড়তে থাকে জনস্রোত। তাঁর তিন বান্ধবীও সেই ভিড়ের নিচে চাপা পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় তরুণেরা মণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে তাঁদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মেডিকেল কলেজে মৃত্যুর মিছিল ও চিকিৎসকদের লড়াই

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া অন্তত ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন, যাঁদের শরীরে রয়েছে একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন।

ছুটির আমেজে সিনিয়র চিকিৎসকরা বাইরে থাকলেও জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। খবর পাওয়ার পরপরই চিকিৎসকেরা হাসপাতালে পৌঁছে মোর্চায় নামেন এবং স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। দুর্ঘটনার তীব্রতায় চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার ব্যবচ্ছেদ

কলকাতার দুর্গাপূজায় মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে এই পদপিষ্টের ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের উৎসবকালীন জনৈক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার এক চরম ব্যর্থতার ছবি ফুটিয়ে তোলে।

প্রথমত, প্রতি বছর সপ্তমী মানেই জনসমুদ্র। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশস্ত প্রবেশ ও নির্গমন পথ (এক্সিট গেট), বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে নিখুঁত পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

দ্বিতীয়ত, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে দর্শনার্থীরা কোথায় আশ্রয় নেবেন বা মণ্ডপের ভেতরে ঠাসাঠাসি রোধে তাৎক্ষণিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় সাধারণ মানুষকে এভাবে মৃত্যুর মুখে পড়তে হলো।

‘দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ’ মনে করে, এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির নেপথ্যে কার বা কাদের অবহেলা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত এবং ভবিষ্যতে যাতে আনন্দ উৎসব আর কখনো এমন শোকের সাগরে না ডোবে, তার কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

তিন বান্ধবীর আর্তনাদ: কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু

আপডেট সময় : ১২:৪২:২৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই মহাশোকে রূপ নেওয়ার এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে কলকাতায়। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপে প্রবল বৃষ্টির জেরে সৃষ্টি হওয়া চরম ভিড় ও হুড়োহুড়ির মাঝে পদপিষ্ট হয়ে অন্তত ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বহু দর্শনার্থী, যাঁদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।

সপ্তমীর সন্ধ্যায় বৃষ্টির হানাদারি ও হুড়োহুড়ি

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড় ছিল। এর মাঝেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে মণ্ডপের মুখে ও প্রবেশপথগুলোতে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কি চরমে ওঠে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বহু মানুষ একযোগে মণ্ডপের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বর্ণনা দিয়ে জানান, তিনি তাঁর তিন বান্ধবীকে নিয়ে মণ্ডপ থেকে বের হওয়ার সময় পিছন থেকে প্রবল ধাক্কা আসে। মুহূর্তের মধ্যে সামনের সারির মানুষগুলো ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান এবং তাঁদের ওপর আছড়ে পড়তে থাকে জনস্রোত। তাঁর তিন বান্ধবীও সেই ভিড়ের নিচে চাপা পড়েন। পরবর্তীতে স্থানীয় তরুণেরা মণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে তাঁদের উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

মেডিকেল কলেজে মৃত্যুর মিছিল ও চিকিৎসকদের লড়াই

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭ জনকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া অন্তত ১৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন, যাঁদের শরীরে রয়েছে একাধিক গুরুতর আঘাতের চিহ্ন।

ছুটির আমেজে সিনিয়র চিকিৎসকরা বাইরে থাকলেও জরুরি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। খবর পাওয়ার পরপরই চিকিৎসকেরা হাসপাতালে পৌঁছে মোর্চায় নামেন এবং স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। দুর্ঘটনার তীব্রতায় চোরবাগান সর্বজনীনের পূজামণ্ডপটি আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার ব্যবচ্ছেদ

কলকাতার দুর্গাপূজায় মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে এই পদপিষ্টের ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের উৎসবকালীন জনৈক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার এক চরম ব্যর্থতার ছবি ফুটিয়ে তোলে।

প্রথমত, প্রতি বছর সপ্তমী মানেই জনসমুদ্র। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশস্ত প্রবেশ ও নির্গমন পথ (এক্সিট গেট), বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে নিখুঁত পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

দ্বিতীয়ত, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে দর্শনার্থীরা কোথায় আশ্রয় নেবেন বা মণ্ডপের ভেতরে ঠাসাঠাসি রোধে তাৎক্ষণিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি না থাকায় সাধারণ মানুষকে এভাবে মৃত্যুর মুখে পড়তে হলো।

‘দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ’ মনে করে, এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির নেপথ্যে কার বা কাদের অবহেলা ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত এবং ভবিষ্যতে যাতে আনন্দ উৎসব আর কখনো এমন শোকের সাগরে না ডোবে, তার কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।