ঢাকা ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে আক্রান্ত অর্ধশতাধিক মানুষ, ২ মাসে মৃত ২০০ পশু

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:৪০:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
  • / 224

রংপুরের তিন উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত দুই মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে এই পশুবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। মূলত অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস খাওয়ার অসচেতনতার কারণেই দ্রুত ছড়াচ্ছে এই রোগ। আক্রান্তদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও গবাদিপশুর টিকার সংকট দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানালেও, স্বাস্থ্য বিভাগ সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

রোগটি বর্তমানে জেলার পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

আক্রান্তের সংখ্যা এবং দুইজনের মৃত্যু

সরকারি হিসাব এবং স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে।

মৃত্যু: চলতি বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে রংপুরের পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুজন মারা গেছেন। এদের মধ্যে একজন কৃষক আব্দুর রাজ্জাক, যিনি আক্রান্ত গরুর মাংস কাটতে গিয়ে সংক্রমিত হন। অন্যজন গৃহবধূ কমলা বেগম, যিনি মাংস ধুতে ও রান্না করতে গিয়ে আক্রান্ত হন।

মানুষ আক্রান্ত: জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে ১১ জন রোগীর তথ্য দেওয়া হলেও, স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। আইইডিসিআর-এর পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে আট জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়।

সংক্রমণের কারণ: মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা এম এ হালিম লাবলু জানান, গবাদিপশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, মাংস বা নাড়িভুঁড়ির সংস্পর্শে এসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।

পশুদের ওপর রোগের প্রভাব ও টিকার সংকট

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিন উপজেলায় প্রায় ১২ লাখের বেশি গরু-ছাগল রয়েছে, যার শতকরা ৩০ ভাগ ইতিমধ্যে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে।

গবাদিপশুর মৃত্যু: গত দুই মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রতিদিন দুই-একটি করে গরু মারা যাচ্ছে। খামারিরা শুরুতে আক্রান্ত গরু কম দামে বিক্রি করে দেওয়ায় সেই মাংস খেয়ে গ্রামের মানুষজন সংক্রমিত হচ্ছেন।

টিকার তীব্র সংকট: পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক জানিয়েছেন, শুধু পীরগাছাতেই প্রায় দেড় লাখ পশু আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে ৫৩ হাজার ৪০০টি টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও আরও ৫০ হাজার টিকার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে, যা এখনো পাওয়া যায়নি।

অন্যান্য উপজেলা: মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায়ও ৮০ হাজার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০ হাজার টিকা বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রয়োগ করা শেষ হয়েছে। বর্তমানে তাদের কাছে কোনো টিকা নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের বক্তব্য

সংকট থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

সিভিল সার্জনের আশ্বাস: রংপুরের সিভিল সার্জন শাহিন সুলতানা জানান, আক্রান্ত তিন উপজেলায় তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অ্যানথ্রাক্স চিকিৎসার অ্যান্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত আছে এবং কোথাও সংকট থাকলে তা সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের ক্ষোভ: জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু ছাইদ বলেন, আগস্ট মাস থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষের নমুনা পরীক্ষা করতে দেরি করেছে, যে কারণে এখন আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিরোধের উপায়: কর্মকর্তারা বলছেন, এই রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোই একমাত্র বিকল্প। অসুস্থ গরু জবাই বা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে জনসাধারণকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে আক্রান্ত অর্ধশতাধিক মানুষ, ২ মাসে মৃত ২০০ পশু

আপডেট সময় : ০১:৪০:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫

রংপুরের তিন উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত দুই মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে এই পশুবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। মূলত অসুস্থ গরু জবাই ও মাংস খাওয়ার অসচেতনতার কারণেই দ্রুত ছড়াচ্ছে এই রোগ। আক্রান্তদের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ও গবাদিপশুর টিকার সংকট দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা জানালেও, স্বাস্থ্য বিভাগ সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করেছে।

রোগটি বর্তমানে জেলার পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

আক্রান্তের সংখ্যা এবং দুইজনের মৃত্যু

সরকারি হিসাব এবং স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে।

মৃত্যু: চলতি বছরের জুলাই ও সেপ্টেম্বরে রংপুরের পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে দুজন মারা গেছেন। এদের মধ্যে একজন কৃষক আব্দুর রাজ্জাক, যিনি আক্রান্ত গরুর মাংস কাটতে গিয়ে সংক্রমিত হন। অন্যজন গৃহবধূ কমলা বেগম, যিনি মাংস ধুতে ও রান্না করতে গিয়ে আক্রান্ত হন।

মানুষ আক্রান্ত: জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে ১১ জন রোগীর তথ্য দেওয়া হলেও, স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। আইইডিসিআর-এর পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে ১২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে আট জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়।

সংক্রমণের কারণ: মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা এম এ হালিম লাবলু জানান, গবাদিপশুর শ্লেষ্মা, লালা, রক্ত, মাংস বা নাড়িভুঁড়ির সংস্পর্শে এসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।

পশুদের ওপর রোগের প্রভাব ও টিকার সংকট

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তিন উপজেলায় প্রায় ১২ লাখের বেশি গরু-ছাগল রয়েছে, যার শতকরা ৩০ ভাগ ইতিমধ্যে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছে।

গবাদিপশুর মৃত্যু: গত দুই মাসে দুই শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে এবং প্রতিদিন দুই-একটি করে গরু মারা যাচ্ছে। খামারিরা শুরুতে আক্রান্ত গরু কম দামে বিক্রি করে দেওয়ায় সেই মাংস খেয়ে গ্রামের মানুষজন সংক্রমিত হচ্ছেন।

টিকার তীব্র সংকট: পীরগাছা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একরামুল হক জানিয়েছেন, শুধু পীরগাছাতেই প্রায় দেড় লাখ পশু আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে ৫৩ হাজার ৪০০টি টিকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও আরও ৫০ হাজার টিকার চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে, যা এখনো পাওয়া যায়নি।

অন্যান্য উপজেলা: মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায়ও ৮০ হাজার চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২০ হাজার টিকা বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল, যা প্রয়োগ করা শেষ হয়েছে। বর্তমানে তাদের কাছে কোনো টিকা নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের বক্তব্য

সংকট থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।

সিভিল সার্জনের আশ্বাস: রংপুরের সিভিল সার্জন শাহিন সুলতানা জানান, আক্রান্ত তিন উপজেলায় তিনটি মেডিক্যাল টিম গঠন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অ্যানথ্রাক্স চিকিৎসার অ্যান্টিবায়োটিক পর্যাপ্ত আছে এবং কোথাও সংকট থাকলে তা সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের ক্ষোভ: জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবু ছাইদ বলেন, আগস্ট মাস থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষের নমুনা পরীক্ষা করতে দেরি করেছে, যে কারণে এখন আক্রান্ত রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

প্রতিরোধের উপায়: কর্মকর্তারা বলছেন, এই রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানোই একমাত্র বিকল্প। অসুস্থ গরু জবাই বা মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে জনসাধারণকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।