বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী থাকলে আ.লীগও থাকবে: ফরহাদ মজহার
- আপডেট সময় : ০৯:৩০:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
- / 97
“যত দিন ‘জামায়াতে ইসলামী’ নাম নিয়ে এই দলটা রাজনীতিতে থাকবে, তত দিন এ দেশে আওয়ামী লীগও টিকে থাকবে!”—রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে ঠিক এই ভাষাতেই এক শাণিত চাবুক ও বিতর্কিত তত্ত্ব ছুড়ে দিলেন বিশিষ্ট কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। ইসলামের মতো পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক দলের পরিচয় হিসেবে ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করে তিনি স্পষ্ট জানান, এই সমীকরণই আসলে ফ্যাসিবাদী শক্তির টিকে থাকার মূল জ্বালানি।
রোববার (২ আগস্ট) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি আয়োজিত ‘৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক বিশেষ সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই হাড়হিম করা রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ করেন। সংলাপে একদিকে যেমন একাত্তরের চেতনা ও জুলাই অভ্যুত্থানের রসায়ন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়, অন্যদিকে ১৯৭২ সালের বর্তমান সংবিধানকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার প্রকাশ্য ডাক দেওয়া হয়।
ঘটনার গভীর ইনসাইড ও সংলাপে উঠে আসা চাবুক বক্তব্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
একাত্তরের অর্জন বনাম ৭২-এর সংবিধান: সরাসরি বাতিলের ডাক
ফরহাদ মজহার তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও অবিসংবাদিত জাতীয় অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি কড়া সুরে বলেন, “এই অর্জনের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা চলবে না। কারণ একাত্তরের মাধ্যমেই আমরা বিশ্বমঞ্চে বাঙালি জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছি।”
তবে এর পরপরই তিনি তোপ দাগেন ১৯৭২ সালের সংবিধানের ওপর। তাঁর চাবুক দাবি, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার যদি সত্যিই চিরতরে অবসান ঘটাতে হয়, তবে পুরোনো এই সংবিধানের জোড়াতালি বা পুনর্বিবেচনা নয়, বরং এটিকে সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। বর্তমান সংবিধানের তীব্র সমালোচনা করে এই চিন্তক বলেন, “এই সংবিধান আদতে জনগণের সার্বভৌমত্বকে শৃঙ্খলিত ও সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। অথচ জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত মালিক। তাই এই তামাদি দলিল বদলে গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।”
ইউনূস সরকার ও ক্ষমতার সমীকরণ: ‘পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়নি’
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো নিয়েও নিজের চরম অসন্তোষ প্রকাশ করতে ছাড়েননি ফরহাদ মজহার। ক্ষমতা কাঠামোর গলদ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণগুলো নিচে সাজানো হলো:
সীমাবদ্ধ অন্তর্বর্তী সরকার: তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন বৈপ্লবিক অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জটিলতার দোহাই দিয়ে তা সুকৌশলে আটকে দেওয়া হয়েছে।
হাসিনার সংবিধানের ফাঁদ: শেখ হাসিনার আমলের স্বৈরাচারী সংবিধান বহাল রেখে কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব সরকার পরিচালনা সম্ভব নয়। এই সংবিধানকে বিগত দিনে স্রেফ জনগণের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিএনপিকে জড়িয়ে পাল্টা যুক্তি: তিনি একটি চাবুক আইনি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “যদি আজ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কেউ অবৈধ বা অসাংবিধানিক বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, তবে একই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ফাঁদে পা দিয়ে অতীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারকেও কিন্তু অবৈধ বলতে হবে।”
| ডিআরইউ সংলাপে উত্থাপিত মূল রাজনৈতিক দাবি |
+———————————————————————————+
| ১. ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল বানানো বন্ধ করা এবং ‘জামায়াতে ইসলামী’ নামের রাজনীতির বিরোধিতা|
| ২. ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনর্বিবেচনা নয়, বরং সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি |
| ৩. শেখ হাসিনার আমলের সংবিধানের খোলস ভেঙে অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান |
+———————————————————————————+
রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও আমলাতন্ত্রের সংস্কার: সরব সাবেক উপদেষ্টারা
সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সাবেক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, “আমাদের সামনে এখন ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের দুই যুগান্তকারী চেতনাকে একসঙ্গে ধারণ করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। কিন্তু ভেতরের চরম দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পুরোনো পচে যাওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর খোলস যদি আমূল সংস্কার করা না যায়, তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কোনোদিনই আসবে না।”
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই হাই-ভোল্টেজ সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, প্রখ্যাত আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ।



















