আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতামত
ইরান যুদ্ধে আত্মসমর্পণই ট্রাম্পের শেষ পরিণতি

- আপডেট সময় : ১২:৩৬:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
- / 109
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতের পথ থেকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছু হটছেন—আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখন এই মন্তব্যই জোরালো হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আকস্মিক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগকে অনেকেই দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের একপ্রকার কৌশলগত আত্মসমর্পণ হিসেবে। পরাজয়ের বড় কোনো বিপর্যয় টের পাওয়ার আগেই ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত এই সংঘাত থেকে সরে আসার পথ খুঁজছে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনালাপ ও ৩০ দিনের পরিকল্পনা:
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গতকাল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক জরুরি ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের সঙ্গে একটি ‘লেটার অব ইন্টেন্ট’ বা সমঝোতা চিঠি নিয়ে আলোচনা করছে। এই সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ৩০ দিনের একটি আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প হয়তো নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত দেখাতে সীমিত আকারে আরেকটি সামরিক হামলা চালাতে পারেন, তবে সেটিকে মূলত একটি ‘প্রতীকী পদক্ষেপ’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ট্রাম্পের এই পিছুটানের বার্তায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু অত্যন্ত উদ্বিগ্ন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন বলে জানা গেছে। কারণ, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
সংকটের পটভূমি ও ইরানের কঠোর শর্ত:
এই তীব্র সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল গত মার্চ মাসে, যখন ইসরায়েল ইরানের পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আকস্মিক হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান কাতারের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদন স্থাপনায় আঘাত হানলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের আহ্বান জানায় এবং কার্যত সরাসরি সংঘাত থমকে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই মাস ধরে তেহরান এটি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে আসছিল যে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার ঝুঁকি নেবেন না। তাই টানা ৩৭ দিনের মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও ইরান কোনো বড় ছাড় দেয়নি। উল্টো দেশটি এখন যুদ্ধক্ষতিপূরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকা, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো কঠোর শর্ত মার্কিন প্রশাসনের সামনে ছুড়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে সুসংহত তেহরান, ভাঙছে নিষেধাজ্ঞা:
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধবিরতির সময়কে কাজে লাগিয়ে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করছে। তেহরান বিভিন্ন তেল আমদানিকারক দেশের সঙ্গে পৃথক ট্রানজিট চুক্তি করছে। যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি নেই, তাদের জাহাজের ওপর অতিরিক্ত ফি আরোপ করা হচ্ছে।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থায় রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র দেশগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানও আলাদা সুবিধা নিয়ে আলোচনা করছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইরাক অন্তর্বর্তী ট্রানজিট চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে না—এটি স্পষ্ট হওয়ার পর অনেক দেশই এখন তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাইছে। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কিউবা ইস্যু:
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত পিছুটান এবং সংকটের গুরুত্ব মার্কিন জনগণের আড়াল করতে ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অন্য কোনো বড় ইস্যু সামনে আনতে পারে। এরই অংশ হিসেবে কিছু মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যে কিউবা ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা শুরু করেছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরান আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে দেশটির একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করবে।

























