এক মণ পেঁয়াজে মেলে না কেজি মাংসও: ফরিদপুরে ফসল পানিতে ফেলছেন কৃষক
- আপডেট সময় : ০৩:২৯:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
- / 42
মাঠে ঘাম ঝরিয়ে ফলানো সোনালী ফসল এখন কৃষকের গলার ফাঁস! উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামও মিলছে না বাজারে। ধারদেনা আর ঋণের কিস্তির চড়া চাবুকের মুখে দাঁড়িয়ে শেষমেশ ক্ষোভ, চরম হতাশা আর বুকফাটা অসহায়ত্ব থেকে নিজেদের উৎপাদিত পেঁয়াজ খালের পানিতে, ডোবায় ফেলে দিচ্ছেন দেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের কৃষকরা। সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোঁয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে বস্তা বস্তা পেঁয়াজ ফেলে দেওয়ার এই মর্মন্তুদ দৃশ্য দেখে শিউরে উঠছেন স্থানীয় মানুষ। কৃষকদের একটাই কথা—বাজারে পানির দরে পেঁয়াজ বেঁচে অপমানিত হওয়ার চেয়ে, তা ফেলে দেওয়াও যেন কম কষ্টের!
শুধু সালথা নয়, জেলার নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও এখন একই মরণফাঁদে পড়েছেন। ফলন বাম্পার হলেও বাজার সিন্ডিকেট আর সংরক্ষণের অভাবে সর্বস্বান্ত হাজারো কৃষক।
খরচ ১৭০০, বাজার দর ৮০০! লোকসানের মহাসমুদ্র
চাষিদের ক্ষোভের আগুন কেন জ্বলছে, তা স্পষ্ট করলেন সালথার চাষি দাউদ মাতুব্বর। তিনি জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। অথচ সার, বীজ, সেচ, চড়া দামের ডিজেল আর শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে এক মণ পেঁয়াজ ফলাতেই পকেট থেকে খসে গেছে ১ হাজার৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা! এখানেই শেষ নয়; ঘরে মাচায় তুলে রাখার পর ৫-৬ মাসে শুকিয়ে ৪০ কেজির মণ নেমে আসে ৩০ কেজিতে। ফলে লাভের গুড় সম্পূর্ণই খাচ্ছে পিঁপড়ে।
আরেক কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর ঝাঁজালো গলায় বললেন, “এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষের খরচ এখন আকাশছোঁয়া। অথচ এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন বাজারে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না! এভাবে চললে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষই ছেড়ে দেবো।”
সরকারি খাতা বনাম কৃষকের বাস্তবতার ফারাক
পেঁয়াজের এই জলের দরে বিক্রি হওয়া নিয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের দাবি, চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন। সরকারি খাতার হিসাব বলছে, প্রতি কেজি পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ২৪ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ ৯৬০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের দাবি, মাঠের বাস্তব চিত্র এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক।
এদিকে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন কৃষকদের এই কষ্টের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে না থাকলেও তিনি ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে বিষয়টি লিখিতভাবে জানাবেন।
সংরক্ষণের অভাব ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারো
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ পচন থেকে বাঁচাতে চলতি বছর জেলায় ৭০০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও আড়াই হাজার মেশিন দেওয়া হবে। তবে কৃষকদের দাবি, এই সামান্য পদক্ষেপে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কোল্ড স্টোরেজ বা আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং বাজার থেকে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়েদের দৌরাত্ম্য না কমালে একসময় চাষিরা পেঁয়াজ চাষ থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নেবেন। আর তার খেসারত দিতে হবে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে।


















