ঢাকা ০৪:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেজর (অব.) আখতারের সেই ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা: জামায়াত থেকে সাবধান

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১১:৫০:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 97

‘পাস করার জন্য ডিউটি লাগবে না, ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাস করবো’—এরকম স্বৈরাচারী সংলাপ কিংবা টক শোতে সহ-আলোচককে ‘জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার’ কুরুচিপূর্ণ হুমকি দেওয়া যেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নিত্যদিনের চরিত্র! একের পর এক দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ-শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ বলে গালি দেওয়া সেই বহুল বিতর্কিত মোটর (অব.) আখতারুজ্জামান অবশেষে পুলিশের জালে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ-ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা, কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ফৌজদারি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক দিনের রিমান্ড শেষে রবিবার আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ নির্দেশ দেন।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি: ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা!’

ঘটনার সূত্রপাত বিমানবন্দরের লাগেজ ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ফুটেজে দেখা যায়, ১ অক্টোবরের ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে তীব্র ভাষায় গালাগাল ও হুংকার দিচ্ছেন আখতারুজ্জামান। তিনি উচ্চকণ্ঠে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা! ঘাড় ধরে বের করে দিবো!”

এর পরপরই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করেন তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন মস্তানি ও প্রশাসনিক কাজে সরাসরি বাধা দেওয়ার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় মামলা রুজু হলে শুক্রবার তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

‘রগ কাটার দল’ থেকে জামায়াতে আশ্রয়: চরম বৈপরীত্যের রাজনীতি

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নিত্যনতুন ভেলকি দেখিয়ে আলোচনার শিরোনামে আসা আখতারুজ্জামান পাঁচ-পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের ঠিক ৬ দিন আগে গণভবনে গিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। শেখ হাসিনাকে ‘দশভুজা দেবী’ আখ্যা দিয়ে পঞ্চমুখ প্রশংসায় মেতেছিলেন তিনি।

শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রগ কাটার দল’, ‘রাজাকার’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে অভিহিত করে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লবের পর সুর বদলে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে আমির শফিকুর রহমানের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে সহযোগী প্রাথমিক সদস্য ফরম পূরণ করে দলটিতে যোগ দেন।

তবে তাঁর গ্রেপ্তারের পর জামায়াতের ভেতরেও শুরু হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল আখতারুজ্জামানকে জামায়াত নেতা দাবি করে মুক্তি চাইলেও ৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে সিনিয়র নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতের কোনো নেতা নন, তিনি কেবল দলের একজন প্রাথমিক সদস্য।”

জুলাই বিপ্লবের বিরোধিতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ক্ষোভ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তীব্র উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই এক টক শোতে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ধারী আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে কলঙ্কিত করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলেছিলেন, “এই আন্দোলনে রাজাকারের সন্তানেরা যুক্ত, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী।” শিক্ষার্থীদের গুম-খুন করাকে বৈধতা দেওয়ার মতো মন্তব্যও করেছিলেন তিনি।

আখতারুজ্জামানের এই চরম ধৃষ্টতা নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন—

“গণ-অভ্যুত্থানের পর এই লোক কীভাবে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়? যে লোকটা মিডিয়ায় গিয়ে জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে সাফাই গাইলো, শিক্ষার্থীদের ‘ট্যাগ’ দিয়ে হাসিনাকে উৎসাহিত করল, তাকে কেন এতদিন বিচারের আওতায় আনা হয়নি?”

মেজর (অব.) আখতারের সেই ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা: জামায়াত থেকে সাবধান

আপডেট সময় : ১১:৫০:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

‘পাস করার জন্য ডিউটি লাগবে না, ঘরে ঘুমিয়ে থাকলেও পাস করবো’—এরকম স্বৈরাচারী সংলাপ কিংবা টক শোতে সহ-আলোচককে ‘জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলার’ কুরুচিপূর্ণ হুমকি দেওয়া যেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নিত্যদিনের চরিত্র! একের পর এক দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ-শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের সন্তান’ বলে গালি দেওয়া সেই বহুল বিতর্কিত মোটর (অব.) আখতারুজ্জামান অবশেষে পুলিশের জালে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ-ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা, কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার ফৌজদারি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এক দিনের রিমান্ড শেষে রবিবার আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ নির্দেশ দেন।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি: ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা!’

ঘটনার সূত্রপাত বিমানবন্দরের লাগেজ ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ফুটেজে দেখা যায়, ১ অক্টোবরের ওই ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে তীব্র ভাষায় গালাগাল ও হুংকার দিচ্ছেন আখতারুজ্জামান। তিনি উচ্চকণ্ঠে হুমকি দিয়ে বলেন, “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা! ঘাড় ধরে বের করে দিবো!”

এর পরপরই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করেন তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন মস্তানি ও প্রশাসনিক কাজে সরাসরি বাধা দেওয়ার অভিযোগে বিমানবন্দর থানায় মামলা রুজু হলে শুক্রবার তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

‘রগ কাটার দল’ থেকে জামায়াতে আশ্রয়: চরম বৈপরীত্যের রাজনীতি

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নিত্যনতুন ভেলকি দেখিয়ে আলোচনার শিরোনামে আসা আখতারুজ্জামান পাঁচ-পাঁচবার বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। ২০২৪ সালের ‘ডামি’ নির্বাচনের ঠিক ৬ দিন আগে গণভবনে গিয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। শেখ হাসিনাকে ‘দশভুজা দেবী’ আখ্যা দিয়ে পঞ্চমুখ প্রশংসায় মেতেছিলেন তিনি।

শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে জামায়াতে ইসলামীকে ‘রগ কাটার দল’, ‘রাজাকার’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে অভিহিত করে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করেছিলেন তিনি। তবে ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লবের পর সুর বদলে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে আমির শফিকুর রহমানের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে সহযোগী প্রাথমিক সদস্য ফরম পূরণ করে দলটিতে যোগ দেন।

তবে তাঁর গ্রেপ্তারের পর জামায়াতের ভেতরেও শুরু হয়েছে তীব্র টানাপোড়েন। দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল আখতারুজ্জামানকে জামায়াত নেতা দাবি করে মুক্তি চাইলেও ৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে সিনিয়র নায়েবে আমির এটিএম আজহারুল ইসলাম পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান জামায়াতের কোনো নেতা নন, তিনি কেবল দলের একজন প্রাথমিক সদস্য।”

জুলাই বিপ্লবের বিরোধিতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ক্ষোভ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তীব্র উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই এক টক শোতে অংশ নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ধারী আখতারুজ্জামান শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনকে কলঙ্কিত করে উত্তেজিত কণ্ঠে বলেছিলেন, “এই আন্দোলনে রাজাকারের সন্তানেরা যুক্ত, তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী।” শিক্ষার্থীদের গুম-খুন করাকে বৈধতা দেওয়ার মতো মন্তব্যও করেছিলেন তিনি।

আখতারুজ্জামানের এই চরম ধৃষ্টতা নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তোলেন—

“গণ-অভ্যুত্থানের পর এই লোক কীভাবে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ায়? যে লোকটা মিডিয়ায় গিয়ে জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে সাফাই গাইলো, শিক্ষার্থীদের ‘ট্যাগ’ দিয়ে হাসিনাকে উৎসাহিত করল, তাকে কেন এতদিন বিচারের আওতায় আনা হয়নি?”