ঢাকা ১০:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে ১ কোটি ৩০ লাখের সড়ক একদিনেই শেষ! হাত দিয়ে তুলছে কার্পেটিং

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৫:২৫:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫
  • / 1277

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার পাচুরিয়া ইউনিয়নের ভেন্নাতলা থেকে বেড়িরহাট পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সড়কের কার্পেটিং একদিনের মধ্যেই হাত দিয়ে তুলে ফেলছেন স্থানীয়রা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ নিম্নমানের বিটুমিন ও সামগ্রী ব্যবহার করায় এমন বেহাল দশা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গেছে এবং ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী চাপড়া চাপড়া কার্পেটিং তুলে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তাদের দাবি, হাত দিয়ে টান দিলেই কার্পেটিং উঠে আসছে, যা নিম্নমানের কাজের স্পষ্ট প্রমাণ।

একদিনের মধ্যেই ধসে গেল প্রত্যাশা: ক্ষুব্ধ জনতার প্রতিবাদ

এলজিইডি কর্তৃক ৩ হাজার ৭০০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। গত শনিবার (১৪ জুন) ভেন্নাতলা অংশে মাত্র ১৫০ মিটার সড়কের কার্পেটিং সম্পন্ন হয়। কিন্তু পরদিন রবিবার (১৫ জুন) দুপুরের ঘটনা সব প্রত্যাশাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। সেদিন সড়ক দিয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী পরে গেলে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। এলাকাবাসী সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে টান দিতেই কার্পেটিং উঠে আসতে শুরু করে।

এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকারী প্রকৌশলীসহ ঠিকাদারের লোকজনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে শতাধিক মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সহকারী প্রকৌশলীসহ ঠিকাদারের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পর থেকে সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে।

ভেন্নাতলা বাজারের মুদি দোকানি জুয়েল রানা বলেন, “শুরু থেকেই নিম্নমানের কাজ করা হচ্ছিল। বিভিন্ন সময় ঠিকাদারকে বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি। শনিবার বিকেলে কার্পেটিংয়ের কাজ হয়। রোববার দুপুরের দিকে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান চলাচল করলে বিভিন্ন জায়গায় দেবে যায়। আমরা সড়কটির বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে দেখি কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। টান দিলেই চাপড়া ধরে উঠে আসছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদি হাসান কাছেদ জানান, “কার্পেটিংয়ের একদিন পর রোববার দুপুরে বাজারে গিয়ে দেখি সড়কের কার্পেটিং হাত দিয়ে তুলছে কয়েকজন। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কার্পেটিং করায় এমন অবস্থা। সহকারী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের লোকজনের সাথে বাকবিতণ্ডা হলে প্রায় দুই-তিনশ স্থানীয় এলাকাবাসী তাদের অবরুদ্ধ করে কাজ বন্ধ করে দেয়।”

ভ্যানচালক সিরাজ বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করেছি। কাজ শুরু হওয়ায় খুব খুশি ছিলাম, কিন্তু এভাবে নিম্নমানের কাজ করা হবে ভাবতে পারিনি। এর চেয়ে আগের রাস্তাই ভালো ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”

ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর ভিন্ন সুর: ৭২ ঘণ্টার অজুহাত!

স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, “সড়কের কার্পেটিংয়ের অধিকাংশ কাজ বাকি রয়েছে। শুরুতেই এমন নিম্নমানের কাজ করায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়েছে। প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের লোকজনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। প্রত্যাশা করছি বাকি কাজটুকু ভালোভাবে সম্পন্ন করবে কর্তৃপক্ষ।”

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহমুদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাহমুদ জানান, “শিডিউল অনুযায়ী সড়কের নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সত্য নয়। এলাকাবাসী বিষয়টি বুঝতে না পারায় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং করার পর ৭২ ঘণ্টা সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী হয় না, কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পরেই তারা কার্পেটিং তুলে অভিযোগ তুলেছে।”

এলজিইডির আলফাডাঙ্গা উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত ইসলাম জানান, “গুণগতমান বজায় রেখেই কাজটি করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় কিছু লোকজন গতকাল বিষয়টি বুঝতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। সাধারণত কার্পেটিংয়ের পর ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে স্থায়ী হতে। তবে ঠিকাদারের গাফিলতি আছে কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয় এলাকাবাসীর বাধার মুখে সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দু-এক দিনের মধ্যে পুনরায় কাজ শুরু করা হবে।

ফরিদপুরে ১ কোটি ৩০ লাখের সড়ক একদিনেই শেষ! হাত দিয়ে তুলছে কার্পেটিং

আপডেট সময় : ০৫:২৫:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার পাচুরিয়া ইউনিয়নের ভেন্নাতলা থেকে বেড়িরহাট পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে চরম অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সড়কের কার্পেটিং একদিনের মধ্যেই হাত দিয়ে তুলে ফেলছেন স্থানীয়রা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ নিম্নমানের বিটুমিন ও সামগ্রী ব্যবহার করায় এমন বেহাল দশা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গেছে এবং ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী চাপড়া চাপড়া কার্পেটিং তুলে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তাদের দাবি, হাত দিয়ে টান দিলেই কার্পেটিং উঠে আসছে, যা নিম্নমানের কাজের স্পষ্ট প্রমাণ।

একদিনের মধ্যেই ধসে গেল প্রত্যাশা: ক্ষুব্ধ জনতার প্রতিবাদ

এলজিইডি কর্তৃক ৩ হাজার ৭০০ মিটার দীর্ঘ এই সড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। গত শনিবার (১৪ জুন) ভেন্নাতলা অংশে মাত্র ১৫০ মিটার সড়কের কার্পেটিং সম্পন্ন হয়। কিন্তু পরদিন রবিবার (১৫ জুন) দুপুরের ঘটনা সব প্রত্যাশাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। সেদিন সড়ক দিয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী পরে গেলে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। এলাকাবাসী সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে টান দিতেই কার্পেটিং উঠে আসতে শুরু করে।

এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সহকারী প্রকৌশলীসহ ঠিকাদারের লোকজনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তাদের সঙ্গে স্থানীয়দের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে শতাধিক মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের অবরুদ্ধ করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সহকারী প্রকৌশলীসহ ঠিকাদারের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এই ঘটনার পর থেকে সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে।

ভেন্নাতলা বাজারের মুদি দোকানি জুয়েল রানা বলেন, “শুরু থেকেই নিম্নমানের কাজ করা হচ্ছিল। বিভিন্ন সময় ঠিকাদারকে বললেও তিনি কর্ণপাত করেননি। শনিবার বিকেলে কার্পেটিংয়ের কাজ হয়। রোববার দুপুরের দিকে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান চলাচল করলে বিভিন্ন জায়গায় দেবে যায়। আমরা সড়কটির বিভিন্ন স্থানে হাত দিয়ে দেখি কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। টান দিলেই চাপড়া ধরে উঠে আসছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদি হাসান কাছেদ জানান, “কার্পেটিংয়ের একদিন পর রোববার দুপুরে বাজারে গিয়ে দেখি সড়কের কার্পেটিং হাত দিয়ে তুলছে কয়েকজন। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কার্পেটিং করায় এমন অবস্থা। সহকারী প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের লোকজনের সাথে বাকবিতণ্ডা হলে প্রায় দুই-তিনশ স্থানীয় এলাকাবাসী তাদের অবরুদ্ধ করে কাজ বন্ধ করে দেয়।”

ভ্যানচালক সিরাজ বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে চলাচল করেছি। কাজ শুরু হওয়ায় খুব খুশি ছিলাম, কিন্তু এভাবে নিম্নমানের কাজ করা হবে ভাবতে পারিনি। এর চেয়ে আগের রাস্তাই ভালো ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”

ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর ভিন্ন সুর: ৭২ ঘণ্টার অজুহাত!

স্থানীয় ইউপি সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, “সড়কের কার্পেটিংয়ের অধিকাংশ কাজ বাকি রয়েছে। শুরুতেই এমন নিম্নমানের কাজ করায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়েছে। প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের লোকজনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। প্রত্যাশা করছি বাকি কাজটুকু ভালোভাবে সম্পন্ন করবে কর্তৃপক্ষ।”

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহমুদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মাহমুদ জানান, “শিডিউল অনুযায়ী সড়কের নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সত্য নয়। এলাকাবাসী বিষয়টি বুঝতে না পারায় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার কার্পেটিং করার পর ৭২ ঘণ্টা সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী হয় না, কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পরেই তারা কার্পেটিং তুলে অভিযোগ তুলেছে।”

এলজিইডির আলফাডাঙ্গা উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত ইসলাম জানান, “গুণগতমান বজায় রেখেই কাজটি করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় কিছু লোকজন গতকাল বিষয়টি বুঝতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে যায়। সাধারণত কার্পেটিংয়ের পর ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে স্থায়ী হতে। তবে ঠিকাদারের গাফিলতি আছে কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয় এলাকাবাসীর বাধার মুখে সড়কের নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দু-এক দিনের মধ্যে পুনরায় কাজ শুরু করা হবে।