কিশোর গ্যাংয়ের দাপট: সন্তান সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবারা
- আপডেট সময় : ০১:১৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 88
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথটুকুও আর নিরাপদ নেই! কখনো হঠাৎ পেছন থেকে এসে পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে অপরিচিত তরুণ, কখনো আবার সমবয়সীদের হাতেই ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে হাতের দামি মুঠোফোন কিংবা চলাচলের সাইকেলটি। তার ওপর কুমিল্লার অপ্রতিম কিংবা উত্তরার আদনানের মতো কিশোরদের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সেই আতঙ্কের আগুনে ঢেলে দিয়েছে ঘৃতাহুতি। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের মফস্বল—সবত্রই এখন ‘কিশোর গ্যাং’ বা অপরাধী চক্রের বিষাক্ত থাবা। একদিকে সন্তানের জীবন রক্ষা আর অন্যদিকে নিজের সন্তান ভুল সঙ্গতে পড়ে বিপথে চলে যাচ্ছে কি না—এই দুইমুখী শঙ্কার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন হাজারো মা-বাবা।
মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসিন্দা তামান্না ইয়াসমিন কিংবা উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কর্মজীবী মা লাকি রহমান—দুজনেরই দিন শুরু হয় এক অদৃশ্য আতঙ্ককে বুকে চেপে। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে প্রতি মুহূর্ত কাটে চরম উৎকণ্ঠায়।
ঘরে ঘরে নজরদারি ও বন্ধুত্বের সাঁকো: মায়েদের ভিন্ন লড়াই
ঢাকার সেন্ট জোসেফ স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওশান। মাস তিনেক আগে স্কুল থেকে ফেরার পথে এক সন্দেহভাজন তরুণের ধাওয়ার মুখে পড়ে বুদ্ধিমত্তার জোরে একটি দোকানে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে যায়। ওশানের মা তামান্না ইয়াসমিন জানান, এর আগে ছেলের দুই বন্ধুর ফোন ও সাইকেল ছিনতাই করে নেয় তাদেরই সমবয়সী কিশোরেরা। সন্তানকে বাজে সঙ্গ থেকে দূরে রাখতে তিনি কৌশল হিসেবে ছেলেকে আইটি ও সায়েন্স ক্লাবের মতো নানা গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রেখেছেন। একই সঙ্গে ছেলের ডিভাইসের পাসওয়ার্ড নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেও তার সঙ্গে বজায় রেখেছেন এক প্রগাঢ় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
অন্যদিকে, উত্তরার বাসিন্দা লাকি রহমানের লড়াইটা আরও কঠিন। তিনি তাঁর ১৩ বছরের ছেলে সাফওয়ানকে আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে ভর্তি করিয়েছেন কারাতে ক্লাসে। টিফিনের জন্য প্রতিদিন গুনে গুনে নির্দিষ্ট ৫০ টাকা দেন এবং যোগাযোগের জন্য দিয়েছেন সাধারণ এক ‘বাটন ফোন’। মায়েরা বলছেন—
“আমরা সন্তানকে ভালো মানুষ করতে সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি। কিন্তু বাইরের নিরাপত্তা যদি সরকার দিতে না পারে, তবে আমাদের সব পরিশ্রমই এক মুহূর্তে বৃথা হয়ে যাবে। একটি কিশোরের স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়ার স্বাধীনতা পাওয়া উচিত।”
অপরাধের ‘সিটি অব গড’ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
২০২৪ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল—সারাদেশে অন্তত ২৩৭টি কিশোর গ্যাং বা অপরাধী দল সক্রিয়। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ঢাকার অপরাধ প্রবণ এলাকাগুলোতে পুলিশি কার্যক্রম সাময়িক শিথিল হওয়ার সুযোগে আধিপত্য বিস্তার করে এসব গ্যাং। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও উত্তরা এলাকায় এদের দৌরাত্ম্য নিয়ে অভিভাবকরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। উত্তরার আদনান কিংবা কুমিল্লার অপ্রতিমকে আইফোন বা তুচ্ছ কারণে খুন করার ঘটনায় উঠে এসেছে ‘আরজেড-৩৬’, ‘ডিসকো বয়েজ’ কিংবা ‘নাইন স্টার’-এর মতো গ্যাংয়ের নাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর বয়সটাই এমন যেখানে অতিরিক্ত নজরদারিকেনজরদারি মনে করে সন্তানরা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে। শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার এবং শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ আঞ্জুমান পারভীন মনে করেন—
“সব মা-বাবার অর্থ ব্যয় করে সন্তানকে ক্লাবে বা খেলায় দেওয়ার সামর্থ্য থাকে না। তাই রাষ্ট্রকেই প্রতিটি এলাকায় নিরাপদ খেলার মাঠ, পার্ক এবং স্কুলভিত্তিক সামাজিক ও মানসিক বিকাশ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। সন্তানকে সন্দেহ না করে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন মা-বাবার মূল চাবিকাঠি।”
কিশোর অপরাধ দমন করতে হলে কেবল পুলিশি অভিযানই শেষ কথা নয়; সমাজ ও পরিবারে ইতিবাচক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধের বিষাক্ত গহ্বর থেকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।



















