ঢাকা ১১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজ ঝুঁকিতে: নেই ডিজাস্টার রিকভারি,সেবা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:০৭:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ মে ২০২৫
  • / 246

১৮ বছর ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিচয়পত্রের বিশাল তথ্যভান্ডার পরিচালনায় ব্যবহার হচ্ছে ওপেনসোর্স ডেটাবেজ, যেগুলোর কোনো এন্টারপ্রাইজ সাপোর্ট নেই। ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো ও অপ্রচলিত অপারেটিং সিস্টেম। ফলে বড় কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধানের উপায় নেই।

ডিআরএস নেই, ঝুঁকিতে এনআইডি সেবা

প্রধান তথ্যভান্ডার নষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যে ‘ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম’ (ডিআরএস) থাকার কথা, তা বিগত নির্বাচন কমিশনগুলো গড়ে তোলে নি। এতে করে কোনো সাইবার হামলা বা দুর্ঘটনায় এনআইডি সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে দীর্ঘ সময়ের জন্য। এমনকি ভোটার তালিকা প্রিন্ট বা নাগরিক তথ্য পুনরুদ্ধারও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

ব্যাকআপ ও মনিটরিং দুর্বলতা

প্রতিদিনের ডেটা ব্যাকআপ এবং সার্ভারের রিসোর্স ব্যবহার মনিটরিংয়ের জন্য নেই একক ইন্টিগ্রেটেড টুলস বা কার্যকরী ড্যাশবোর্ড। একেক ডেটাবেজের জন্য একেক পদ্ধতি ব্যবহার হওয়ায় তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

জাতীয় পরিচয়পত্র সিস্টেমের কারিগরি নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কর্মকর্তাদের হাতে। নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী কর্মকর্তারা এ খাতে কর্তৃত্বহীন। তবে ধীরে ধীরে ইসির নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বায়োমেট্রিকসহ ৪৬ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত

তথ্যভান্ডারে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি নাগরিকের বায়োমেট্রিকসহ ৪৬ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য। এখান থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত সব সেবা পরিচালিত হয়। ১৮৭টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এনআইডি তথ্য ব্যবহার করছে।

তথ্য ফাঁসের নজির, সুরক্ষায় ঘাটতি

ইসির নিজস্ব সাইবার অডিট কমিটির রিপোর্টে জানা গেছে, পূর্বে ইউসিবি ব্যাংক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এনআইডি তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষকে তথ্য দিয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ওয়েবসাইট থেকেও তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

তথ্য যাচাই পদ্ধতিতে পরিবর্তন

বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান এনআইডি ডেটা যাচাই করে, তাদের সরাসরি তথ্য না দিয়ে শুধু হ্যাঁ/না ভিত্তিক সঠিকতা জানানো হবে এমন একটি নিরাপদ পদ্ধতির দিকে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এতে করে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্মার্ট এনআইডি এখন ওরাকল ডেটাবেজ নির্ভর

২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওরাকল ডেটাবেজে নাগরিকদের তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। এরপর থেকে ওপেনসোর্স ডেটাবেজে স্থানান্তর করা হলেও, স্মার্ট এনআইডি ছাপাতে এখনো ওরাকল নির্ভরতা রয়েছে। তবে পুরোনো ওরাকল ডেটাবেজেরও আর কোনো সাপোর্ট নেই।

তিন প্রকল্পে খরচ হয়েছে হাজার কোটি টাকা

এনআইডি তথ্যভান্ডার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনটি পৃথক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে চলছে ১,৮০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইডিইএ-২’ প্রকল্প।

ডিআরএস স্থাপন চূড়ান্ত পর্যায়ে, সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে পরিদর্শন

ইসি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে যশোর, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া ও বরিশাল অঞ্চলে ডিআরএস স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছেন। নিরাপদ বিদ্যুৎ, ভূমিকম্পপ্রবণতা বিবেচনায় স্থান নির্ধারণ হবে বলে জানান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

সারাংশ:
জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে একাধিক প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা সংকট। ডিআরএস অনুপস্থিতি, ব্যাকআপ দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতা—সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক তথ্য ঝুঁকির মুখে। নির্বাচন কমিশন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে তা কতটা কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে।

জাতীয় পরিচয়পত্র ডেটাবেজ ঝুঁকিতে: নেই ডিজাস্টার রিকভারি,সেবা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা

আপডেট সময় : ০১:০৭:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ মে ২০২৫

১৮ বছর ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় পরিচয়পত্রের বিশাল তথ্যভান্ডার পরিচালনায় ব্যবহার হচ্ছে ওপেনসোর্স ডেটাবেজ, যেগুলোর কোনো এন্টারপ্রাইজ সাপোর্ট নেই। ব্যবহার করা হচ্ছে পুরোনো ও অপ্রচলিত অপারেটিং সিস্টেম। ফলে বড় কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধানের উপায় নেই।

ডিআরএস নেই, ঝুঁকিতে এনআইডি সেবা

প্রধান তথ্যভান্ডার নষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যে ‘ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম’ (ডিআরএস) থাকার কথা, তা বিগত নির্বাচন কমিশনগুলো গড়ে তোলে নি। এতে করে কোনো সাইবার হামলা বা দুর্ঘটনায় এনআইডি সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে দীর্ঘ সময়ের জন্য। এমনকি ভোটার তালিকা প্রিন্ট বা নাগরিক তথ্য পুনরুদ্ধারও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

ব্যাকআপ ও মনিটরিং দুর্বলতা

প্রতিদিনের ডেটা ব্যাকআপ এবং সার্ভারের রিসোর্স ব্যবহার মনিটরিংয়ের জন্য নেই একক ইন্টিগ্রেটেড টুলস বা কার্যকরী ড্যাশবোর্ড। একেক ডেটাবেজের জন্য একেক পদ্ধতি ব্যবহার হওয়ায় তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ

জাতীয় পরিচয়পত্র সিস্টেমের কারিগরি নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কর্মকর্তাদের হাতে। নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী কর্মকর্তারা এ খাতে কর্তৃত্বহীন। তবে ধীরে ধীরে ইসির নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বায়োমেট্রিকসহ ৪৬ ধরনের তথ্য সংরক্ষিত

তথ্যভান্ডারে রয়েছে প্রায় সাড়ে ১২ কোটি নাগরিকের বায়োমেট্রিকসহ ৪৬ ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য। এখান থেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, যাচাই ও নিবন্ধন সংক্রান্ত সব সেবা পরিচালিত হয়। ১৮৭টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এনআইডি তথ্য ব্যবহার করছে।

তথ্য ফাঁসের নজির, সুরক্ষায় ঘাটতি

ইসির নিজস্ব সাইবার অডিট কমিটির রিপোর্টে জানা গেছে, পূর্বে ইউসিবি ব্যাংক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এনআইডি তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষকে তথ্য দিয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয় ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ওয়েবসাইট থেকেও তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।

তথ্য যাচাই পদ্ধতিতে পরিবর্তন

বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান এনআইডি ডেটা যাচাই করে, তাদের সরাসরি তথ্য না দিয়ে শুধু হ্যাঁ/না ভিত্তিক সঠিকতা জানানো হবে এমন একটি নিরাপদ পদ্ধতির দিকে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এতে করে তথ্য ফাঁসের ঝুঁকি হ্রাস পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্মার্ট এনআইডি এখন ওরাকল ডেটাবেজ নির্ভর

২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওরাকল ডেটাবেজে নাগরিকদের তথ্য সংরক্ষণ করা হতো। এরপর থেকে ওপেনসোর্স ডেটাবেজে স্থানান্তর করা হলেও, স্মার্ট এনআইডি ছাপাতে এখনো ওরাকল নির্ভরতা রয়েছে। তবে পুরোনো ওরাকল ডেটাবেজেরও আর কোনো সাপোর্ট নেই।

তিন প্রকল্পে খরচ হয়েছে হাজার কোটি টাকা

এনআইডি তথ্যভান্ডার তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনটি পৃথক প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে চলছে ১,৮০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘আইডিইএ-২’ প্রকল্প।

ডিআরএস স্থাপন চূড়ান্ত পর্যায়ে, সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে পরিদর্শন

ইসি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে যশোর, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া ও বরিশাল অঞ্চলে ডিআরএস স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছেন। নিরাপদ বিদ্যুৎ, ভূমিকম্পপ্রবণতা বিবেচনায় স্থান নির্ধারণ হবে বলে জানান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।

সারাংশ:
জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনায় রয়েছে একাধিক প্রযুক্তিগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা সংকট। ডিআরএস অনুপস্থিতি, ব্যাকআপ দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রণহীনতা—সব মিলিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক তথ্য ঝুঁকির মুখে। নির্বাচন কমিশন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবে তা কতটা কার্যকর হবে তা সময়ই বলে দেবে।