ঢাকা ০৩:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার সুনামি: ৪৮ দলের বিশ্বকাপে বিদায় নিল স্পেন-ব্রাজিল

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:০৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / 182

ফিফা যদি বাণিজ্য বাড়াতেও বিশ্বকাপের কলেবর ৪৮ দলের করে থাকে, তবে ফুটবল বিধাতা যেন তার সদ্ব্যবহার করলেন দুই হাত উজাড় করে! ইতিহাসের বৃহত্তম ফুটবল মহাযজ্ঞের গ্রুপ পর্ব শেষেই বিশ্ব ফুটবল দেখল এক অভূতপূর্ব আফ্রিকান সুনামি। ফেবারিটের তকমা গায়ে নিয়ে আসা স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল কিংবা নেইমারের ব্রাজিল—আফ্রিকানদের চিতার গতি আর শারীরিক ফুটবলের সামনে খাবি খেয়েছে প্রত্যেকেই। রেকর্ড ১০টি আফ্রিকান দেশের মধ্যে তিউনিসিয়া বাদে বাকি ৯টি দলই দাপটের সঙ্গে নক-আউট পর্বের টিকিট কেটে কাঁপিয়ে দিয়েছে ইউরোপ-লাতিনের দম্ভ।

আর এই রূপকথার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র— কেপ ভার্দে। যারা প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে এসেই ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছে।

স্পেন-উরুগুয়েকে বিদায় করে ইন্টারনেট কাঁপালেন ৪০ বছরের বুড়ো ভোজিনহা:

ফিফার দল বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পেয়েছিল কেপ ভার্দে। সমালোচকরা ভেবেছিলেন, এরা তো স্রেফ ‘পয়েন্ট বিতরণের মেশিন’ হবে। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে নামতেই দেখা গেল উল্টো পুরাণ। নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিল তারা। আর সেই ম্যাচে স্প্যানিশ আক্রমণের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাচসেরা হলেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। রাতারাতি এই বুড়ো গোলরক্ষক ইন্টারনেট সেনসেশন! তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী এক ধাক্কায় পৌঁছে গেছে ১ কোটি ৭০ লাখে। এরপর দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরবকেও রুখে দিয়ে মাঠ থেকে বিদায় করে দেয় এই পুঁচকে দেশটা। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউটে উঠে রূপকথা লিখল তারা।

‘এবার বিশ্বকাপ জিতবে আফ্রিকা, এটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা’:

আফ্রিকার এই গর্জন দেখে আলজেরিয়ার মহাতারকা রিয়াদ মাহারেজ স্পষ্টই বললেন, “১০ দলের মধ্যে ৯টি পরের রাউন্ডে যাওয়া মানে আফ্রিকান ফুটবলের গুণগত মান আজ প্রমাণিত।” চার বছর আগে মরক্কো সেমিফাইনালে উঠে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এবার যেন তা সংক্রামিত হয়েছে পুরো মহাদেশে। প্রথম ম্যাচেই ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ ড্র করে দাপট দেখিয়েছে সেই ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা।

ডিআর কঙ্গোর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে তো আরও একধাপ এগিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে দিলেন, “আমি ১৫ বছর ধরে আফ্রিকায় কাজ করছি। কোচ-খেলোয়াড়দের মান যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই বছর বা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কোনো আফ্রিকান দেশ বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরবে। এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

উড়ল আফ্রিকা, মুখ থুবড়ে পড়ল এশিয়া ও কনকাকাফ:

আফ্রিকার এই জয়জয়কারের বিপরীতে দল বাড়ার ফায়দা তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এশিয়া ও কনকাকাফ অঞ্চল। বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা সরাসরি খেলায় কনকাকাফ অঞ্চল থেকে সুযোগ পেয়েছিল কুরাসাও, হাইতি ও পানামার মতো দল। কিন্তু তারা একটা ম্যাচ তো দূর, একটি পয়েন্টও ঘরে তুলতে পারেনি। অন্যদিকে এশিয়ার ৯টি দেশের মধ্যে কেবল জাপান আর অস্ট্রেলিয়াই নকআউটের মুখ দেখেছে। জর্ডান ও উজবেকিস্তান কোনো পয়েন্টই পায়নি, আর ইরাক হজম করেছে রেকর্ড ১২ গোল।

মেসি-এমবাপের গোলবন্যা, তবে কি কমছে বিশ্বকাপের মান?

লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়াস জুনিয়র কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো মহাতারকারা গ্রুপ পর্বে পায়ের জাদু দেখালেও দল বাড়ানোর নেতিবাচক দিকটাও স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিযোগিতার সামগ্রিক মান কিছুটা কমেছে বলেই মনে করছেন বোদ্ধারা। গ্রুপ পর্বেই চার বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছে ৮টি! যা গত তিনটি বিশ্বকাপ মেলালেও দেখা যায়নি। তবে মান কমুক বা বাড়ুক, এই বিশ্বকাপ যে বিশ্বফুটবলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটা ইউরোপ-লাতিন থেকে আফ্রিকার দিকে অনেকটাই ঝুঁকিয়ে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

বিশ্বমঞ্চে আফ্রিকার সুনামি: ৪৮ দলের বিশ্বকাপে বিদায় নিল স্পেন-ব্রাজিল

আপডেট সময় : ০৮:০৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ফিফা যদি বাণিজ্য বাড়াতেও বিশ্বকাপের কলেবর ৪৮ দলের করে থাকে, তবে ফুটবল বিধাতা যেন তার সদ্ব্যবহার করলেন দুই হাত উজাড় করে! ইতিহাসের বৃহত্তম ফুটবল মহাযজ্ঞের গ্রুপ পর্ব শেষেই বিশ্ব ফুটবল দেখল এক অভূতপূর্ব আফ্রিকান সুনামি। ফেবারিটের তকমা গায়ে নিয়ে আসা স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল কিংবা নেইমারের ব্রাজিল—আফ্রিকানদের চিতার গতি আর শারীরিক ফুটবলের সামনে খাবি খেয়েছে প্রত্যেকেই। রেকর্ড ১০টি আফ্রিকান দেশের মধ্যে তিউনিসিয়া বাদে বাকি ৯টি দলই দাপটের সঙ্গে নক-আউট পর্বের টিকিট কেটে কাঁপিয়ে দিয়েছে ইউরোপ-লাতিনের দম্ভ।

আর এই রূপকথার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার এক ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র— কেপ ভার্দে। যারা প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে এসেই ইতিহাস ওলটপালট করে দিয়েছে।

স্পেন-উরুগুয়েকে বিদায় করে ইন্টারনেট কাঁপালেন ৪০ বছরের বুড়ো ভোজিনহা:

ফিফার দল বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপে খেলার টিকিট পেয়েছিল কেপ ভার্দে। সমালোচকরা ভেবেছিলেন, এরা তো স্রেফ ‘পয়েন্ট বিতরণের মেশিন’ হবে। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে নামতেই দেখা গেল উল্টো পুরাণ। নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিল তারা। আর সেই ম্যাচে স্প্যানিশ আক্রমণের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাচসেরা হলেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। রাতারাতি এই বুড়ো গোলরক্ষক ইন্টারনেট সেনসেশন! তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী এক ধাক্কায় পৌঁছে গেছে ১ কোটি ৭০ লাখে। এরপর দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং ২০৩৪ বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরবকেও রুখে দিয়ে মাঠ থেকে বিদায় করে দেয় এই পুঁচকে দেশটা। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে নকআউটে উঠে রূপকথা লিখল তারা।

‘এবার বিশ্বকাপ জিতবে আফ্রিকা, এটা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা’:

আফ্রিকার এই গর্জন দেখে আলজেরিয়ার মহাতারকা রিয়াদ মাহারেজ স্পষ্টই বললেন, “১০ দলের মধ্যে ৯টি পরের রাউন্ডে যাওয়া মানে আফ্রিকান ফুটবলের গুণগত মান আজ প্রমাণিত।” চার বছর আগে মরক্কো সেমিফাইনালে উঠে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এবার যেন তা সংক্রামিত হয়েছে পুরো মহাদেশে। প্রথম ম্যাচেই ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ ড্র করে দাপট দেখিয়েছে সেই ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা।

ডিআর কঙ্গোর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে তো আরও একধাপ এগিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে দিলেন, “আমি ১৫ বছর ধরে আফ্রিকায় কাজ করছি। কোচ-খেলোয়াড়দের মান যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই বছর বা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কোনো আফ্রিকান দেশ বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরবে। এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

উড়ল আফ্রিকা, মুখ থুবড়ে পড়ল এশিয়া ও কনকাকাফ:

আফ্রিকার এই জয়জয়কারের বিপরীতে দল বাড়ার ফায়দা তুলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এশিয়া ও কনকাকাফ অঞ্চল। বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা সরাসরি খেলায় কনকাকাফ অঞ্চল থেকে সুযোগ পেয়েছিল কুরাসাও, হাইতি ও পানামার মতো দল। কিন্তু তারা একটা ম্যাচ তো দূর, একটি পয়েন্টও ঘরে তুলতে পারেনি। অন্যদিকে এশিয়ার ৯টি দেশের মধ্যে কেবল জাপান আর অস্ট্রেলিয়াই নকআউটের মুখ দেখেছে। জর্ডান ও উজবেকিস্তান কোনো পয়েন্টই পায়নি, আর ইরাক হজম করেছে রেকর্ড ১২ গোল।

মেসি-এমবাপের গোলবন্যা, তবে কি কমছে বিশ্বকাপের মান?

লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়াস জুনিয়র কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো মহাতারকারা গ্রুপ পর্বে পায়ের জাদু দেখালেও দল বাড়ানোর নেতিবাচক দিকটাও স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিযোগিতার সামগ্রিক মান কিছুটা কমেছে বলেই মনে করছেন বোদ্ধারা। গ্রুপ পর্বেই চার বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছে ৮টি! যা গত তিনটি বিশ্বকাপ মেলালেও দেখা যায়নি। তবে মান কমুক বা বাড়ুক, এই বিশ্বকাপ যে বিশ্বফুটবলে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটা ইউরোপ-লাতিন থেকে আফ্রিকার দিকে অনেকটাই ঝুঁকিয়ে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।