ওয়ারেন্টের আসামি ‘নিখোঁজ’ পুলিশের খাতায়, অথচ দেখা গেল পুলিশেরই মঞ্চে
- আপডেট সময় : ০১:০১:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
- / 37
অর্থ আত্মসাতের মামলায় আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ঢাকা মহানগরীর রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহম্মেদ রাজু। পুলিশ নথিপত্রে তাকে ‘পলাতক’ দেখিয়ে খুঁজে পাচ্ছে না বলে দাবি করলেও, খোদ পুলিশেরই এক জমকালো অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রথম সারিতে অতিথি হিসেবে দেখা গেছে এই বিএনপি নেতাকে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও এভাবে পুলিশের পাশে তার প্রকাশ্য উপস্থিতি নিয়ে এখন নানা মহলে তীব্র তোলপাড় ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
৬ মাস ধরে ‘পলাতক’, অথচ পুলিশের মঞ্চেই অতিথি!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলী আহম্মেদের গ্রামের বাড়ি বগুড়ায় হলেও তিনি ঢাকায় তুরাগ ও রূপনগর এলাকায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। গত ২৮ এপ্রিল রূপনগর মাঠে স্থানীয় থানা পুলিশ আয়োজিত ‘ওপেন হাউস ডে’ অনুষ্ঠানের মঞ্চে তাকে ফ্রেমবন্দি করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই অনুষ্ঠানে সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ঘুরে বেড়ালেও তাকে গ্রেপ্তার না করায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মামলার বাদী।
কোটি টাকার অর্থ আত্মসাৎ ও সাজাপ্রাপ্ত আসামি:
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করার অভিযোগে গত বছরের ২৯ নভেম্বর বগুড়ার আদালতে আলী আহম্মেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন মো. মোস্তাক তা-সীন নামের এক ব্যবসায়ী। আলী আহম্মেদ ‘টুইনটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
এই মামলায় গত ১ জানুয়ারি বগুড়ার আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করেন। আদালত সূত্রের খবর অনুযায়ী, আলী আহম্মেদের বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে অর্থ আত্মসাতসহ মোট আটটি মামলা রয়েছে এবং একটি মামলায় ইতিমধ্যে তার সাজাও হয়েছে। এমনকি আদালতে হাজির হতে গত ৪ মে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও তিনি হাজির হননি।
পুলিশ সদর দপ্তরে নালিশ করেও মেলেনি প্রতিকার:
বগুড়ার আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি ঢাকার তুরাগ থানায় পাঠানো হলেও পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেনি। নিরুপায় হয়ে মামলার বাদী মোস্তাক তা-সীন গত ৯ মার্চ পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগের পরও আসামিকে ধরা হয়নি; উল্টো এরপরই তাকে পুলিশের ভিআইপি মঞ্চে প্রতিমন্ত্রীর পাশে দেখা যায়।
বাদীর অভিযোগ, আসামির অবস্থান বারবার পুলিশকে জানানোর পরও তুরাগ থানার ওসি বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেননি। রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের তদবিরের কারণেই পুলিশ এখানে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
যা বলছেন আসামি ও পুলিশ:
ওয়ারেন্ট থাকার পরও কীভাবে পুলিশের মঞ্চে গেলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতা আলী আহম্মেদ রাজু মুঠোফোনে দাবি করেন, তিনি বগুড়ার এই মামলার বিষয়ে আগে কিছুই জানতেন না। গত সপ্তাহে থানা থেকে ফোন পেয়ে তিনি ওয়ারেন্টের কথা জানতে পেরেছেন এবং বর্তমানে হাইকোর্টে আগাম জামিনের চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে, তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এই ধরণের কোনো ঘটনা বা পরোয়ানার বিষয় তার জানা নেই। তবে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো আসামির ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। অর্থঋণ বা সাধারণ অপরাধের মামলায় ওয়ারেন্ট থাকলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
উদ্বেগ প্রকাশ করে মামলার বাদী মোস্তাক তা-সীন বলেন, ‘রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাব খাটিয়ে আলী আহম্মেদ রাজুকে গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ। উল্টো এই সুযোগে তিনি এখন আমাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। আমি আমার জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত।’
























