ফরিদপুরে মাদক সন্দেহে যুবককে গণধোলাই ও গাড়ি পুড়িয়ে ছাই
- আপডেট সময় : ১১:৩৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
- / 64
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে মামুন মোল্লা (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি এবং তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকারে আগুন দেওয়ার ঘটনায় এলাকা জুড়ে চরম উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে গণধোলাই ও গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর পুলিশি তল্লাশিতে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো ধরনের মাদক উদ্ধার না হওয়ায় পুরো ঘটনাটি এখন সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে।
গতকাল সোমবার (২২ জুন) সন্ধ্যায় বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের মালিখালী বাজার এলাকায় এই তুমুল কাণ্ড ঘটে।
মাদক নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা?
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, মামুন মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে মামুনের পরিবারের দাবি, অতীতের কিছু অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরনো শত্রুতার জেরে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই হামলার শিকার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যার দিকে মামুন মোল্লা একটি প্রাইভেটকার নিয়ে মালিখালী বাজার এলাকায় আসলে কয়েকজন তাকে মাদক ব্যবসায়ী বলে চিৎকার শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে উত্তেজিত জনতা জড়ো হয়ে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে গণপিটুনি দেয়। একপর্যায়ে উগ্র জনতা তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাতের পর আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে বোয়ালমারী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তারা আহত মামুনকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যায়।
স্বাভাবিক জীবনে ফেরার দাবি পরিবারের:
আহত মামুনের বাবা মানিক মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার ছেলে ফরিদপুর আদালতে একটি মামলার হাজিরা দিয়ে বাড়িতে এসেছিল। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক আত্মীয়ের প্রাইভেটকার নিয়ে সে বের হয়। কিন্তু পথে পরিকল্পিতভাবে তাকে আটকে মারধর করা হয় এবং গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ তার কাছে কোনো মাদক ছিল না।’
তিনি আরও দাবি করেন, তার ছেলে অতীতে মাদকাসক্ত থাকলেও অনেক আগেই সেই পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন নিজের হাতে না তুলে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আইন নিজের হাতে নেওয়া কতটা যৌক্তিক?
মালিখালী বাজারের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু মাদক না পাওয়ার পরও কোনো ব্যক্তিকে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়া এবং গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মামুনের বিরুদ্ধে অতীতে মাদক সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। স্থানীয়রা তাকে মারধর করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে ঘটনার পর তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গাড়ি ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনার পর পুরো বোয়ালমারী জুড়ে এখন একটাই আলোচনা—মাদকবিরোধী ক্ষোভ কতটা ন্যায়সঙ্গত আর আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য? স্থানীয় সচেতন মহল ও আইনজীবীরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার আদালতের। শুধু সন্দেহের বশে কাউকে মারধর করা কিংবা রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধ্বংস করা আইনের চোখে মস্ত বড় অপরাধ।



















