ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে ৫১ হাজার নিখোঁজ, ক্ষীণ হচ্ছে জীবিত উদ্ধারের আশা
- আপডেট সময় : ১১:৩২:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- / 34
প্রকৃতির চরম তাণ্ডবে চোখের পলকে নরককুণ্ডে পরিণত ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা! পরপর দুটি শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের পর এখন চারদিকে শুধুই লাশের গন্ধ আর স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ। সময় যত গড়াচ্ছে, কংক্রিটের চাঁইয়ের নিচে আটকে থাকা হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার আশা ততই অলৌকিক হয়ে উঠছে। রাজধানী কারাকাস থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের হাসপাতাল, মর্গ আর আশ্রয়শিবিরে নিখোঁজ পরিজনদের সন্ধানে পাগলের মতো হন্যে হয়ে ছুটছেন অসংখ্য মানুষ। এখনও পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজারের গণ্ডি!
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার ওই যমজ কম্পনে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৯২০ পার করেছে। জখম সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের দাবি, গত এক শতাব্দীরও বেশি সময়ে ভেনেজুয়েলার বুকে আছড়ে পড়া এটাই সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প।
লাশের পাহাড়, আতঙ্কের আফটারশক!
ধ্বংসযজ্ঞের ক্ষত কাটার আগেই শুক্রবার বিকেলে ফের কেঁপে ওঠে কারাকাস ও মারাকাই শহর। ৪.৯ মাত্রার নতুন ‘আফটারশক’ হতেই ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন আতঙ্কিত বাসিন্দারা। এদিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে সরকারি উদ্ধারকাজে ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ মানুষ। ক্রেন বা ভারী যন্ত্রপাতির দেখা নেই, তাই খালি হাতেই ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। হুগো শ্যাভেজ হাউজিং কমপ্লেক্সের ধসে পড়া বহুতলের সামনে দাঁড়িয়ে জেনিফার পালাসিও নামের এক মা ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “ভেতরে আমার ছ’বছরের সন্তানসহ পরিবারের পাঁচজন আটকে আছে! সরকার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে, কোনো ক্রেন আসছে না!”
অন্য এক শহরে ৭৩ বছরের আইনজীবী রিকার্ডো ত্রিয়াস ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানালেন, তাঁর ধর্ম-সন্তানের নিথর দেহ উদ্ধার হলেও তা সরানোর কোনো ব্যবস্থা করেনি প্রশাসন। এরই মধ্যে আবার কাতিয়া লা মার এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানপাটে লুঠপাটের ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে।
ক্ষয়ক্ষতি ৮০ হাজার কোটি, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে প্রেসিডেন্ট!
জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব বলছে, এই বিপর্যয়ে সরাসরি আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার সমান! এই মহাসংকট এখন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি তড়িঘড়ি ফোনে কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে।
বিপর্যয়ের গুরুত্ব বুঝে চিরবৈরী ভেনেজুয়েলার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ১৫ কোটি ডলারের জরুরি সাহায্য পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার ও বিমান এখন উদ্ধারকাজে ব্যস্ত। পাশাপাশি এল সালভাদরের ৫০ সদস্যের একটি বিশেষ কমান্ডো দল ড্রোন, থার্মাল স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছে। একটি বহুতল ভবনের নবম তলায় আটকে থাকা ১৫ বছরের এক কিশোরী ও তার পোষা কুকুরকে বের করে আনার টানটান রোমাঞ্চকর লড়াই চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। সেখান থেকে এখনও মানুষের সাড়াশব্দ মিলছে।
মৃতের সংখ্যা ছাড়াতে পারে ১০ হাজার!
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) লাল সংকেত জারি করে জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত এই জোড়া কম্পনে নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে! আর তেমনটা হলে এটি ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহতম ট্র্যাজেডি হিসেবে কালো পাতায় লেখা থাকবে। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার আশঙ্কা, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৭০ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সর্বস্বান্ত হতে চলেছেন।





















