ঢাকা ১০:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যাংক খাতের লুটপাটের দায়ে সরকারের ঋণ খরচে আগুন

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:১৪:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৫
  • / 371

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে ঋণের নামে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। এই লুটের টাকার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার ও আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে এই অর্থ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না, যার কারণে ব্যাংক খাতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র তারল্য সংকট।

সুদ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংক, চাপে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা

এই তারল্য সংকটের ফলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ঋণের সুদের হারও, যা সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণের কারণেও ঋণের সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী।

সরকারকেও নিতে হচ্ছে চড়া সুদে ঋণ

তারল্য সংকটের কারণে এখন সরকারও ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান কমেছে এবং সরকার ঋণ নিতে গিয়ে বেশি সুদের হার গুনছে। এতে ব্যাংক খাতের দুর্নীতির বোঝা এখন সরকারের ঘাড়েও এসে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সংকট শুরু ২০২৩ সাল থেকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম গ্রুপের দখলে থাকা সাতটি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি বড় ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়ে। এর ফলে ঋণের সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।

বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো

সরকার যে সকল ট্রেজারি বিল ও বন্ড নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে ঋণ সংগ্রহ করে, তা কিনতে এখন আগ্রহ হারাচ্ছে অনেক ব্যাংক। আগে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী থাকলেও বর্তমানে তারা স্বল্পমেয়াদি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। তবুও নিলামে অংশ নেওয়া অর্থের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় সুদের হার ক্রমেই বাড়ছে।

ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কয়েকগুণ বেড়েছে

২০২৩ সালের জুন মাসে ৩ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ছিল ৬.৮০ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে ১১.২৪ শতাংশ। ৬ মাস মেয়াদির হার ছিল ৭.০৭ শতাংশ, এখন তা ১১.৪৫ শতাংশ। এক বছর মেয়াদির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১.৭৫ শতাংশে। সরকার ওই দিনে এসব উচ্চ সুদে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেছে।

দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের অবস্থাও উদ্বেগজনক

২ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ৮.০৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২.১৮ শতাংশ হয়েছে। ৫ বছরের বন্ডের হার ৮.৭১ থেকে বেড়ে ১১.৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১০, ১৫ এবং ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

ইসলামী বন্ডেও বেড়েছে মুনাফার হার

বাংলাদেশ সরকার ইসলামী ইনভেস্টমেন্ট বন্ডেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ৬ মাস মেয়াদি বন্ডের মুনাফার হার এখন সর্বনিম্ন ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। ৩ মাস মেয়াদির হার ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এই দিনেই সরকার ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

নন-ব্যাংক খাতেও সুদের চাপ বেড়েছে

ব্যাংকে ঋণ কম পাওয়ায় সরকার এখন নন-ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নন-ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ খাতের সুদের হার আরও বেশি, ফলে সরকারের সুদ খাতে ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে।

সাবেক সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধেও চাপ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়কালে সরকার ব্যাংক থেকে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, যার বড় একটি অংশ আগের সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছাপানো টাকার ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকায়। আলোচ্য সময়ে সরকার ছাপানো টাকায় ৫৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করেছে।

ব্যাংক খাতের লুটপাটের দায়ে সরকারের ঋণ খরচে আগুন

আপডেট সময় : ১২:১৪:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৫

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে ঋণের নামে সংঘটিত হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। এই লুটের টাকার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার ও আত্মসাৎ করা হয়েছে। ফলে এই অর্থ আর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে না, যার কারণে ব্যাংক খাতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র তারল্য সংকট।

সুদ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংক, চাপে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা

এই তারল্য সংকটের ফলে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। একইসঙ্গে বেড়েছে ঋণের সুদের হারও, যা সাধারণ গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়ের ওপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণের কারণেও ঋণের সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী।

সরকারকেও নিতে হচ্ছে চড়া সুদে ঋণ

তারল্য সংকটের কারণে এখন সরকারও ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান কমেছে এবং সরকার ঋণ নিতে গিয়ে বেশি সুদের হার গুনছে। এতে ব্যাংক খাতের দুর্নীতির বোঝা এখন সরকারের ঘাড়েও এসে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সংকট শুরু ২০২৩ সাল থেকে

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ইসলামী ব্যাংকসহ এস আলম গ্রুপের দখলে থাকা সাতটি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং জনতা ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি বড় ব্যাংক চরম তারল্য সংকটে পড়ে। এর ফলে ঋণের সুদের হার ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে।

বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে ব্যাংকগুলো

সরকার যে সকল ট্রেজারি বিল ও বন্ড নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে ঋণ সংগ্রহ করে, তা কিনতে এখন আগ্রহ হারাচ্ছে অনেক ব্যাংক। আগে ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী থাকলেও বর্তমানে তারা স্বল্পমেয়াদি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। তবুও নিলামে অংশ নেওয়া অর্থের পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় সুদের হার ক্রমেই বাড়ছে।

ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার কয়েকগুণ বেড়েছে

২০২৩ সালের জুন মাসে ৩ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদের হার ছিল ৬.৮০ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে ১১.২৪ শতাংশ। ৬ মাস মেয়াদির হার ছিল ৭.০৭ শতাংশ, এখন তা ১১.৪৫ শতাংশ। এক বছর মেয়াদির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১.৭৫ শতাংশে। সরকার ওই দিনে এসব উচ্চ সুদে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেছে।

দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের অবস্থাও উদ্বেগজনক

২ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার ৮.০৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২.১৮ শতাংশ হয়েছে। ৫ বছরের বন্ডের হার ৮.৭১ থেকে বেড়ে ১১.৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ১০, ১৫ এবং ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

ইসলামী বন্ডেও বেড়েছে মুনাফার হার

বাংলাদেশ সরকার ইসলামী ইনভেস্টমেন্ট বন্ডেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ৬ মাস মেয়াদি বন্ডের মুনাফার হার এখন সর্বনিম্ন ৯ থেকে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। ৩ মাস মেয়াদির হার ৮ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এই দিনেই সরকার ১ হাজার ২২৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

নন-ব্যাংক খাতেও সুদের চাপ বেড়েছে

ব্যাংকে ঋণ কম পাওয়ায় সরকার এখন নন-ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নন-ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিয়েছে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ খাতের সুদের হার আরও বেশি, ফলে সরকারের সুদ খাতে ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে।

সাবেক সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধেও চাপ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়কালে সরকার ব্যাংক থেকে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, যার বড় একটি অংশ আগের সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছাপানো টাকার ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকায়। আলোচ্য সময়ে সরকার ছাপানো টাকায় ৫৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করেছে।