নির্বাচনে নতুন বিতর্ক: আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির রহস্য
- আপডেট সময় : ১২:৫৩:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩০ জুন ২০২৫
- / 283
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ (Proportional Representation- PR) বা সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচনের প্রস্তুতি চললেও, হঠাৎ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে এই অচেনা পদ্ধতির নির্বাচন ইস্যু গুরুত্ব পাচ্ছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত জনগণ যখন ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে, তখন এই নতুন বিতর্ক কেন – এ প্রশ্ন এখন সর্বত্রই আলোচিত হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কয়েক মাস পর থেকেই নির্বাচনের টাইমফ্রেম নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সরকারের ভেতরে কিছু ব্যক্তির ‘ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার বাসনা’ এবং ‘নির্বাচন হলেই গুরুত্ব কমে যাবে’ এমন ধারণার ভিত্তিতে কিছু দল সংস্কারের পর নির্বাচনের আওয়াজ তোলে। কিন্তু ঐতিহাসিক লন্ডন বৈঠকের পর এবং রোজার আগে জনগণকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বার্তা দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনও প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে প্রায় ১২ কোটি ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন।
কেন হঠাৎ পিআর পদ্ধতি?
‘৯১-এর পর থেকে বিএনপির অনুকম্পায় সংসদে জামায়াতের সামান্য প্রতিনিধিত্ব ছাড়া যাদের তেমন কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না, তারাই হঠাৎ করে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি তুলছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সেই দাবিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দিনের পর দিন বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। এর নেপথ্যের রহস্য কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনমনে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এই দাবির মাধ্যমে কি ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চাওয়া হচ্ছে, নাকি জনসমর্থন না থাকায় সারা দেশের প্রাপ্ত ভোটে নিজেদের সংসদে যাওয়া নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন ক্ষুদ্র দলগুলো? ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার পদেও বিজয়ী হওয়ার মতো জনসমর্থন নেই এমন নেতারা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনে এমপি হয়ে সংসদে গেলে জনগণের স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করছেন অনেকে।
ভারতের নীলনকশা ও রাজনৈতিক দলের ফাঁদ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শেখ হাসিনা পালানো এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকে হিন্দুত্ববাদী ভারত একের পর এক বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। প্রতিটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন আগামী সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার নীলনকশা করছে। এটি তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হলেও তাদের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ভোটার সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, আগামী নির্বাচনে ওই ভোটাররা আওয়ামী লীগ এবং কৌশলগতভাবে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দেবেন। এতে করে ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ পদ্ধতির নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা কমপক্ষে শতাধিক আসনে বিজয় অর্জন করতে পারবে।
অন্যদিকে, বিএনপি ব্যাপক জনপ্রিয় হলেও ভোটের হিসাবে দলটির কার্যত ভোটারের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে। জোটগতভাবে ভোট করলে এই সংখ্যা কিছুটা বাড়তে পারে। ফলে আওয়ামী লীগকে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে নেওয়ার ভারতীয় নীলনকশা বাস্তবায়নে কি ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব’ দাবি জোরালো করে তোলার চেষ্টায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হচ্ছে? আর অতীতে সংসদে যাদের জনপ্রতিনিধিত্ব তেমন ছিল না এবং যাদের ছিল সেটিও যৎসামান্য, তাদের দাবি অধিক গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দিনের পর দিন আলোচনা চালিয়ে যাবে কেন—এ প্রশ্নও উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
নেটিজেনদের কেউ কেউ বলছেন, ‘যারা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায় তারা পিআর ইস্যুকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ এই ঐকমত্য কমিশনের যে অবস্থা, তাতে মাসের পর মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করলেও এসব ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানো যাবে না।’ নেটিজেনদের কেউ কেউ লিখেছেন, ‘জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে হঠাৎ করে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি সামনে নিয়ে এসেছেন।’
বিভিন্ন দলের অবস্থান ও বিশ্লেষকদের মতামত
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম বলেন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার হরণের নতুন ষড়যন্ত্র। এই পদ্ধতিতে নির্বাচন দেশের জনগণ কখনো দেখেনি এবং অভ্যস্তও নয়। এটি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পাতানো ফাঁদ। তিনি এটিকে ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নতুন করে এদেশে পুনর্বাসনের আরেকটি গভীর ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের চেতনাকে নিঃশেষ করে দেবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এ নতুন পদ্ধতিতে নির্বাচনের কোনো ষড়যন্ত্র করা হয়, তাহলে এদেশের সাধারণ জনগণ মাঠে নেমে আসবে এবং যেকোনো মূল্যে তাদের ভোটাধিকার রক্ষায় আন্দোলন সংগ্রাম করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, কার এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হঠাৎ করে কিছু দল পিআর পদ্ধতির নির্বাচন দাবি জোরদার করতে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ২৮ জুন ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশে অংশ নেওয়া জামায়াত, এনসিপি, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল ও হিন্দু নেতারা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি জানিয়ে সোচ্চার বক্তব্য দেন। অথচ ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে দা-কুড়াল সম্পর্ক। তিনি উল্লেখ করেন, হাসিনা রেজিমেনর ১৫ বছর বিএনপিসহ কোনো দল সভা-সমাবেশ করতে না পারলেও ইসলামী আন্দোলন পুলিশি প্রহরায় সমাবেশ করেছে এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ব্যাপক প্রচারণা চালাতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, ‘দলটি দীর্ঘ ১৫ বছর যে আওয়ামী লীগ তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, আগামী সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি তোলা হচ্ছে। জামায়াতের স্বার্থ অন্যখানে এবং ছোট ছোট দলগুলো বিএনপির সঙ্গে বার্গেনিং শক্তি বাড়াতে পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবিতে সুর মেলাচ্ছে।’
দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন এবং ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন এমন একাধিক দলের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগেও ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় পিআর পদ্ধতি তেমন গুরুত্ব পায়নি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামী আন্দোলনের মহাসমাবেশের দু’দিন আগ থেকে এ দাবি হঠাৎ করে জোরালো হয়। এই সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদের নেতারাই একই দাবি জানান। এ ছাড়া, বোধিজ্ঞান ভাবনাকেন্দ্রের সভাপতি দয়াল কুমার বড়ুয়া, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও এবং হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকও একই দাবি তুলে ধরেন। গোবিন্দ প্রমাণিক হুমকি দিয়ে বলেন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের হিন্দু ভোটাররা ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যাবে না। তাদের বক্তব্যে দিল্লির এজেন্ডা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সমাবেশে হাজির হওয়ার বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এর আগে দিল্লিকে খুশি করতে জামায়াত দলের হিন্দু শাখা গঠন করেছে এবং দলটির আমির নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলেট মহিলা মেডিকেল কলেজে ২০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ডাক্তার-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ভিডিও করে দিল্লিতে পাঠিয়েছেন। তিনি ‘ফ্যাসিস্ট বলতে ভালো লাগে না’, ‘আমরা ভারতের বিরুদ্ধে নই’, ‘আমরা সব মাফ করে দিয়েছি’ এবং ‘জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মেয়েরা যেমন খুশি তেমন পোশাক পরে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারবে’ এমন বক্তব্য দিয়ে দিল্লির আস্থা অর্জনের চেষ্টা করেন।
সমাবেশে ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। সংসদের প্রস্তাবিত উভয় কক্ষেই এ পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে হবে। এটি হলে কোনো দল জালেম হওয়ার সুযোগ পাবে না। আমরা ৫৪ বছরে অনেক দলকে দেশ শাসন করতে দেখেছি; কিন্তু ইসলামকে ক্ষমতায় নিতেই পারিনি। এবার ইসলামপন্থিদের ঐক্যের ব্যাপারে গণপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।’ তার এই বক্তব্য নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক চলছে।
পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের আমির ড. ঈশা সাহেদী ইনকিলাবকে বলেন, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন আমি নিজেও বুঝি না; জনগণও বুঝে না। কারো কারো নতুন আবিষ্কার পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের দাবি বাইরের কোনো রাষ্ট্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নের স্লোগান কি-না সে বিষয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হচ্ছে।
ভোটার পরিসংখ্যান ও পিআর পদ্ধতির অযোগ্যতা
নিরপেক্ষ হিসেবে বিবেচিত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ গড়ে ৩৮.৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং আসন পেয়েছিল গড়ে ১৩১টি। অন্যদিকে, বিএনপি গড়ে ৩৪.৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল এবং আসন পেয়েছিল গড়ে ১২০টি। জামায়াত গড়ে ৭.৪৩ শতাংশ ভোট এবং ১০টি আসন পেয়েছিল। অন্যান্য দলের আসন সংখ্যা হিসাব করার মতো অবস্থানে ছিল না। এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে, পিআর পদ্ধতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এবং ইতোপূর্বে সংস্কার কমিশনের সঙ্গে আমাদের যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে, সেই পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের মধ্যে আমরা কোনো ঐকমত্য পাইনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আনুপাতিক হারে নির্বাচনের ইতিহাস নেই এবং সংসদীয় রাজনীতিতে এটি একটি নতুন ধারণা, যা দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। আনুপাতিক হারে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো সংসদীয় এলাকার ভোটাররা জানবেন না যে, কে তাদের এমপি হবেন এবং প্রয়োজনে এমপিদের কাছে তারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাবেন না।
রাজনীতি বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জোবাইদা নাসরীন বলেন, আনুপাতিক পদ্ধতিতে সরাসরি ভোটে এমপি নির্বাচনের ব্যবস্থা না থাকায় সংসদে কারা যাবেন, সেটি পুরোপুরি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘আমরা আগে দেখেছি, দুর্নীতির মাধ্যমে মনোনয়ন কেনাবেচা হয়, পিআর পদ্ধতির নির্বাচন হলে প্রতিনিধি কেনাবেচা ভয়াবহ রূপ নেবে।’


























