৩ নম্বর সতর্কসংকেত ও ৫ নদীর তোড়ে বানভাসি বাংলাদেশ, আতঙ্কে উপকূল
- আপডেট সময় : ০৩:০৪:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
- / 120
আকাশভাঙা বৃষ্টি আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের যুগলবন্দি—প্রকৃতির এই জোড়া ফলায় আরও একবার জলমগ্ন বাংলাদেশের একটা বিস্তীর্ণ অংশ। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ আর টানা বর্ষণে দেশের নদ-নদীর বুক চিরে ফুঁসে উঠছে জল। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালের সরকারি খতিয়ান বলছে, দেশের অন্তত ৫টি প্রধান নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুধু নদী নয়, ফুঁসছে সমুদ্রও; চট্টগ্রাম, মোংলা, পায়রা ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে জারি করা হয়েছে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের চোখে এখন কেবলই ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক আর বিনিদ্র রাত।
গত ২৪ ঘণ্টায় ওপার বাংলার মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ১০৯ মিলিমিটার জল ঝরেছে, আর এপারে চট্টগ্রামে রেকর্ড করা হয়েছে সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি। উজানের সেই জল আর এপার বাংলার মেঘের থাবায় নদীগুলো এখন যেন এক একটি জীবন্ত রাক্ষস।
বিপৎসীমার ওপরে সাঙ্গু-মাতামুহুরী: জলবন্দি পাহাড় ও সমতল
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সকাল ৯টার বুলেটিন বিশ্লেষণ করলে যে শিউরে ওঠার মতো চিত্র পাওয়া যায়, তা নিম্নরূপ:
নদীর নাম পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট বিপৎসীমার কত ওপরে (সেমি)
সাঙ্গু বান্দরবান ৯৫ সেমি
সাঙ্গু দোহাজারী ২৩ সেমি
মনু মৌলভীবাজার ৮০ সেমি
খোয়াই বল্লা (হবিগঞ্জ) ৬০ সেমি
মাতামুহুরী লামা ৪৭ সেমি
মনু মনু রেলসেতু ৩৫ সেমি
মাতামুহুরী চিরিঙ্গা (কক্সবাজার) ৩২ সেমি
কুশিয়ারা মারকুলি (সুনামগঞ্জ) ১৮ সেমি
কুশিয়ারা ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) ১০ সেমি
এ ছাড়া তিস্তা, সুরমা, সোমেশ্বরী ও ছোট ফেনী নদীর পানিও একদম সতর্কসীমার কানায় কানায় এসে ঠেকেছে। যেকোনো মুহূর্তে এই নদীগুলোও লোকালয় গ্রাস করতে ধেয়ে আসতে পারে। দেশের ১২৭টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতেই পানি বাড়ছে হু হু করে।
সাময়িক স্বস্তি নাকি ঝড়ের আগের স্তব্ধতা?
পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা আশার বাণী শোনাতে পারলেন না বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান। তিনি গণমাধ্যমকে জানান—
“বৃহস্পতির তুলনায় আজ শুক্রবার পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে সত্যি। তবে সামনের দিনগুলোতে বন্যা কোন দিকে মোড় নেবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আগামী কয়েকদিনে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং সীমান্তের ওপারে উজানে কতটা বৃষ্টি হচ্ছে তার ওপর।”
প্রকৃতির খেয়াল বনাম মানুষের নিয়তি
প্রথম আলোর সেই দায়িত্বশীল ও সুদূরপ্রসারী পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয় যে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছরই উজান আর সাগরের এই দ্বিমুখী মারের শিকার হতে হয় বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষকে। বাঁধের দুর্বলতা আর নদী ভাঙন এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আর আনন্দবাজারের ক্ষুরধার চাবুক প্রশ্ন তোলে—চেরাপুঞ্জিতে মেঘ জমলে কিংবা সাগরে নিম্নচাপ তৈরি হলেই কেন এদেশের ৫টি নদীর পানি উপচে হাজার হাজার মানুষকে ঘরছাড়া হতে হবে? ‘পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি’র চেনা সরকারি আশ্বাস কি প্লাবিত গ্রামের ওই কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের কান্না থামাতে পারে? উজান ও দেশের ভেতরের এই বৃষ্টির খেলা আগামী কয়েকদিনে আরও কত মানুষের স্বপ্ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।



















