ঢাকা ১০:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে: দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ-ভাঙচুর

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬
  • / 46

আকাশে যেন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড! ওভেনের মতো গনগনে গরমে একদিকে যখন হাঁসফাঁস করছে জনজীবন, ঠিক তখনই দোসর হয়েছে চড়া মাত্রার লোডশেডিং। আর তার ওপরে যদি যোগ হয় ফুটবল বিশ্বকাপের টানটান উত্তেজনা, তবে বারুদে আগুন লাগা তো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা! ঠিক সেটাই ঘটল। ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন লোডশেডিং হতেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল আমজনতার। ক্ষোভে-আক্রোশে নেত্রকোনায় বিদ্যুৎ দপ্তরে চলল দেদার ভাঙচুর ও ইট-বৃষ্টি, টাঙ্গাইলে অবরুদ্ধ হলো জাতীয় মহাসড়ক। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রাণভয়ে ও নিরাপত্তার দাবিতে এখন পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন খোদ বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্তারা!

রবিবার সকাল থেকেই দেশের একাধিক জেলায় কার্যত আছড়ে পড়েছে গ্রাহকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সুনামি। কোথাও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, কোথাও ভুতুড়ে বিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ, আবার কোথাও প্রচার গাড়ি আটকে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার মতো ঘটনায় তোলপাড় গোটা দেশ।

মেসি-নেইমারদের লড়াই দেখতে না পেয়ে বিদ্যুৎ অফিসে ইট-বৃষ্টি!

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় আজ সকালে আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডান ম্যাচ চলাকালীন আচমকাই গায়েব হয়ে যায় বিদ্যুৎ। বিশ্বযুদ্ধের মতো সেই ম্যাচ দেখতে না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শ’খানেক উন্মত্ত যুবক। ‘খেলা দেখতে দাও’ স্লোগান তুলে তাঁরা চড়াও হন স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে আসে ইট-পাটকেল। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় কার্যালয়ের জানালার কাচ। প্রাণভয়ে ভেতরের দরজা বন্ধ করে আত্মগোপন করেন বিদ্যুৎ কর্মীরা। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দপ্তরের ডিজিএম ওমরের দাবি, পিক আওয়ারে যেখানে প্রয়োজন ২৭ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ মিলেছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট! ফলে বাধ্য হয়েই হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছে তাঁদের।

অবরুদ্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, ভুতুড়ে বিলের বিরুদ্ধে দোহারে গর্জন

এদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে সাবস্টেশনের সামনে জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করেন হাজার হাজার গ্রাহক। দীর্ঘ এক ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের দু’পাশে থমকে যায় চাকা, তৈরি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ ওঠে। নাগরপুর ও দেলদুয়ারের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে জরুরি চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় সাংসদও।

অন্যদিকে, ঢাকার দোহারে ভুতুড়ে বিল আদায়ের প্রতিবাদ এবং অসহ্য লোডশেডিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও সড়ক অবরোধ করে চলে গ্রাহকদের তুমুল বিক্ষোভ ও মানববন্ধন।

ঝালকাঠিতে মানববন্ধন, সিলেটে সাবস্টেশনে ঢুকে ব্ল্যাকআউট!

প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়েছে দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠিতেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার জোগাড়, মাথায় হাত পরীক্ষার্থীদের। ‘মানবকল্যাণ সোসাইটি’র ব্যানারে ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে দীর্ঘ মানববন্ধন করে অবিলম্বে এই চরম নৈরাজ্য বন্ধের দাবি জানানো হয়।

সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। সেখানে মাঝরাতে একদল মানুষ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে সশরীরে ঢুকে কর্মরত লাইনম্যানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখায়। শুধু তাই নয়, যাওয়ার আগে সাবস্টেশনের মূল সুইচ (৩৩ কেভি এসিআর) বন্ধ করে দিয়ে পুরো এলাকাকে নিমিষেই অন্ধকবারে ডুবিয়ে দিয়ে যায় তারা!

মোবাইলে খুনের হুমকি, প্রাণভয়ে পুলিশ ডাকছেন বিদ্যুৎ কর্তারা!

শেরপুরে পরিস্থিতি আরও সংগিন। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলাকালে বিদ্যুৎ গেলেই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মোবাইলে আসছে একের পর এক হুমকি-ধমকি ও কার্যালয় উড়িয়ে দেওয়ার বার্তা! শেষমেশ বাধ্য হয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং দপ্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপার ও পাঁচ থানার ওসির কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহীর বাগমারাতেও ক্ষোভের আঁচ থেকে রেহাই পায়নি বিদ্যুৎ দপ্তর। লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে ও ধৈর্য্য ধরতে মাইকিং করার সময় পল্লী বিদ্যুতের প্রচার গাড়িটিই আটকে দেয় উন্মত্ত জনতা। অবস্থা বেগতিক দেখে জান বাঁচিয়ে চম্পট দেয় গাড়িটি।

চাহিদা আকাশছোঁয়া, জোগানে কেবলই শূন্যতা!

নজিরবিহীন এই সংকটের কথা স্বীকার করে বিদ্যুৎ বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে, তীব্র গরম ও ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম। ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি থেকে এখনই মুক্তি মিলছে না দেশবাসীর, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে: দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ-ভাঙচুর

আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬

আকাশে যেন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড! ওভেনের মতো গনগনে গরমে একদিকে যখন হাঁসফাঁস করছে জনজীবন, ঠিক তখনই দোসর হয়েছে চড়া মাত্রার লোডশেডিং। আর তার ওপরে যদি যোগ হয় ফুটবল বিশ্বকাপের টানটান উত্তেজনা, তবে বারুদে আগুন লাগা তো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা! ঠিক সেটাই ঘটল। ফুটবল ম্যাচ চলাকালীন লোডশেডিং হতেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙল আমজনতার। ক্ষোভে-আক্রোশে নেত্রকোনায় বিদ্যুৎ দপ্তরে চলল দেদার ভাঙচুর ও ইট-বৃষ্টি, টাঙ্গাইলে অবরুদ্ধ হলো জাতীয় মহাসড়ক। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রাণভয়ে ও নিরাপত্তার দাবিতে এখন পুলিশের দ্বারস্থ হচ্ছেন খোদ বিদ্যুৎ দপ্তরের কর্তারা!

রবিবার সকাল থেকেই দেশের একাধিক জেলায় কার্যত আছড়ে পড়েছে গ্রাহকদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের সুনামি। কোথাও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, কোথাও ভুতুড়ে বিলের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ, আবার কোথাও প্রচার গাড়ি আটকে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার মতো ঘটনায় তোলপাড় গোটা দেশ।

মেসি-নেইমারদের লড়াই দেখতে না পেয়ে বিদ্যুৎ অফিসে ইট-বৃষ্টি!

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় আজ সকালে আর্জেন্টিনা বনাম জর্ডান ম্যাচ চলাকালীন আচমকাই গায়েব হয়ে যায় বিদ্যুৎ। বিশ্বযুদ্ধের মতো সেই ম্যাচ দেখতে না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন শ’খানেক উন্মত্ত যুবক। ‘খেলা দেখতে দাও’ স্লোগান তুলে তাঁরা চড়াও হন স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল কার্যালয়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে ধেয়ে আসে ইট-পাটকেল। মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় কার্যালয়ের জানালার কাচ। প্রাণভয়ে ভেতরের দরজা বন্ধ করে আত্মগোপন করেন বিদ্যুৎ কর্মীরা। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

দপ্তরের ডিজিএম ওমরের দাবি, পিক আওয়ারে যেখানে প্রয়োজন ২৭ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ মিলেছে মাত্র ৭ মেগাওয়াট! ফলে বাধ্য হয়েই হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছে তাঁদের।

অবরুদ্ধ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, ভুতুড়ে বিলের বিরুদ্ধে দোহারে গর্জন

এদিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের দাবিতে টাঙ্গাইলের জামুর্কীতে সাবস্টেশনের সামনে জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করেন হাজার হাজার গ্রাহক। দীর্ঘ এক ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের দু’পাশে থমকে যায় চাকা, তৈরি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ ওঠে। নাগরপুর ও দেলদুয়ারের তীব্র বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে জরুরি চিঠি দিয়েছেন স্থানীয় সাংসদও।

অন্যদিকে, ঢাকার দোহারে ভুতুড়ে বিল আদায়ের প্রতিবাদ এবং অসহ্য লোডশেডিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও সড়ক অবরোধ করে চলে গ্রাহকদের তুমুল বিক্ষোভ ও মানববন্ধন।

ঝালকাঠিতে মানববন্ধন, সিলেটে সাবস্টেশনে ঢুকে ব্ল্যাকআউট!

প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়েছে দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠিতেও। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার জোগাড়, মাথায় হাত পরীক্ষার্থীদের। ‘মানবকল্যাণ সোসাইটি’র ব্যানারে ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সামনে দীর্ঘ মানববন্ধন করে অবিলম্বে এই চরম নৈরাজ্য বন্ধের দাবি জানানো হয়।

সবচেয়ে দুর্ধর্ষ ঘটনাটি ঘটেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে। সেখানে মাঝরাতে একদল মানুষ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে সশরীরে ঢুকে কর্মরত লাইনম্যানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি দেখায়। শুধু তাই নয়, যাওয়ার আগে সাবস্টেশনের মূল সুইচ (৩৩ কেভি এসিআর) বন্ধ করে দিয়ে পুরো এলাকাকে নিমিষেই অন্ধকবারে ডুবিয়ে দিয়ে যায় তারা!

মোবাইলে খুনের হুমকি, প্রাণভয়ে পুলিশ ডাকছেন বিদ্যুৎ কর্তারা!

শেরপুরে পরিস্থিতি আরও সংগিন। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলাকালে বিদ্যুৎ গেলেই কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত মোবাইলে আসছে একের পর এক হুমকি-ধমকি ও কার্যালয় উড়িয়ে দেওয়ার বার্তা! শেষমেশ বাধ্য হয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এবং দপ্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশ সুপার ও পাঁচ থানার ওসির কাছে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ।

রাজশাহীর বাগমারাতেও ক্ষোভের আঁচ থেকে রেহাই পায়নি বিদ্যুৎ দপ্তর। লোডশেডিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে ও ধৈর্য্য ধরতে মাইকিং করার সময় পল্লী বিদ্যুতের প্রচার গাড়িটিই আটকে দেয় উন্মত্ত জনতা। অবস্থা বেগতিক দেখে জান বাঁচিয়ে চম্পট দেয় গাড়িটি।

চাহিদা আকাশছোঁয়া, জোগানে কেবলই শূন্যতা!

নজিরবিহীন এই সংকটের কথা স্বীকার করে বিদ্যুৎ বিভাগ স্পষ্ট জানিয়েছে, তীব্র গরম ও ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা এক ধাক্কায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে অর্ধেকেরও কম। ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি থেকে এখনই মুক্তি মিলছে না দেশবাসীর, তা একপ্রকার নিশ্চিত।