ফরিদপুরে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের খবরে ২ সন্তানকে নিয়ে মায়ের বিষপান, শিশুর মৃত্যু
- আপডেট সময় : ০৯:২৪:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / 82
পরতে পরতে প্রতারণা, অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন আর পাঁচ লাখ টাকা যৌতুকের রক্তচক্ষু! স্বামী নামের এক পাষণ্ডের লোভ আর দ্বিতীয় বিয়ের খবরে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন দুই সন্তানের জননী আছিয়া বেগম। বহুবার সংসার টিকিয়ে রাখার আকুতি জানিয়েও পাননি কোনো সাড়া। অবশেষে স্বামীর সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার পর জীবনের সব হতাশা ঢাকতে নিজের বুকের ধন দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে কীটনাশকের পেয়ালায় চুমুক দিলেন মা! বিষের যন্ত্রণায় ছোট্ট জিসানের নিথর দেহ চিরতরে এলিয়ে পড়লেও হাসপাতালের বেডে ধুঁকছেন মা ও তাঁর পাঁচ বছরের বোন।
স্বামীর বিরুদ্ধে পৈশাচিক নির্যাতন, প্রতারণা ও যৌতুক দাবির অভিযোগ এনে দীর্ঘ মানসিক টানাপোড়েনের জেরে দুই সন্তানসহ কীটনাশক পান করেছেন আছিয়া বেগম (২৮) নামে এক গৃহবধূ। এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনায় ১৯ মাসের কোলের শিশু জিসানের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, আশঙ্কাজনক অবস্থায় মা আছিয়া বেগম ও তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে তাবিয়া মিনহা বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
গত ৩ নভেম্বর ২০২৬ সোমবার বিকেলে ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভার কলারণ গ্রামে গৃহবধূর বাবার বাড়িতে এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে।
বিয়ে থেকে শুরু করে বিদেশে পাঠানোর নেপথ্য কাহিনী
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে বোয়ালমারীর রূপাপাত ইউনিয়নের রূপাপাত গ্রামের আকমাল শেখের ছেলে আমিনুর শেখের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আছিয়ার। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর পক্ষ থেকে যৌতুকের জন্য নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি। মেয়ের সংসারটি কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে এবং অভাব ঘোচাতে প্রায় দেড় বছর আগে বাবা সত্তার মোল্যা ঋণ করে এবং ভিজিট ভিসার খরচ বাবদ প্রায় পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করে আমিনুরকে বিদেশে পাঠান।
কিন্তু বিদেশে গিয়েও লোভের শেষ হয়নি আমিনুরের। পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালের শেষের দিকে বা ২০২৫ সালের ২৮ মে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার পর আকামা নবায়নের কথা বলে আমিনুর আরও তিন লাখ টাকা দাবি করেন। মেয়ের সুখের কথা ভেবে বাবা সত্তার মোল্যা সেই টাকাও পরিশোধ করেন। কিন্তু টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরই কুচক্রী আমিনুর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গোপনে দেশে ফিরে আসেন। স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে তিনি গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং তাদের যাবতীয় ভরণপোষণ দেওয়া চিরতরে বন্ধ করে দেন।
চলতি বছরের ১৩ আগস্ট গোপনে দেশে ফিরে আসার পর আমিনুর আবার বিদেশে যাওয়ার কথা বলে আছিয়ার কাছে নতুন করে পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এই নিয়ে কথাকাটাকাতির একপর্যায়ে তিন সন্তানসহ আছিয়াকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে আছিয়া তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে নিজের বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেন এবং স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন।
সালিশ বৈঠক ও চরম হতাশা
মামলা দায়েরের পর স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর আছিয়ার বাবার বাড়িতে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে আমিনুর ও তাঁর স্বজনেরা সাফ জানিয়ে দেন যে, পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক না দিলে আছিয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করা হবে না; উল্টো তাঁকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ঠিক ওই সময়ই আছিয়া ও তাঁর পরিবার জানতে পারেন যে আমিনুর তাঁদের অন্ধকারে রেখে গোপনে আরেকটি বিয়ে করেছেন।
স্বামীর প্রতারণা ও কুলকিনারা না পেয়ে আছিয়া যেকোনো মূল્યે নিজের দীর্ঘদিনের সংসারটি টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমিনুরের নতুন মুঠোফোন নম্বর জোগাড় করে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। গত ৩ নভেম্বর বিকেলে স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন আছিয়া। এরপরই তিনি চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে থাকা কীটনাশক পান করেন।
উদ্ধার ও মর্মান্তিক পরিণতি
বাড়ির লোকজনের অজান্তে কীটনাশক পানের পর তাঁরা ছটফট করতে থাকলে স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ মাসের শিশু জিসান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর মা আছিয়া ও পাঁচ বছরের কন্যা তাবিয়া মিনহা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে দ্বীন ইসলাম (১০) স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগে পড়াশোনা করায় সে ওইদিনের মর্মান্তিক ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। তবে এমন ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “ময়নাতদন্ত শেষে শিশু জিসানের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বর্তমানে মা আছিয়া বেগম পুলিশ পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁর স্বামী আমিনুর রহমানও আছিয়ার করা নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির মামলার অন্যতম পলাতক আসামি। তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”

















