ঢাকা ১০:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে ঋণের চাপে যুবকের আত্মহত্যা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:৫৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
  • / 124

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চড়া সুদে ঋণ তুলে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর মালয়েশিয়ায়। কিন্তু ভাগ্য ফিরেনি, উল্টো দালালের প্রতারণা আর আকামার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় দেড় বছর পর খালি হাতে, সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। দেশে ফিরে পেটের দায়ে সেলুনের দোকানে কাঁচি চালিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পিছু ছাড়েনি বিভিন্ন এনজিওর ছয় লক্ষাধিক টাকার ঋণের তড়পানি ও সাপ্তাহিক কিস্তির তাগাদা। অবশেষে এনজিওর সেই অমানবিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার কাছে নতিস্বীকার করে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিলেন ফরিদপুরের বোয়ালমারীর তরুণ গোবিন্দ বিশ্বাস।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসদরের দক্ষিণ কামারগ্রাম ঋষিপাড়ায় এনজিওর চড়া সুদের ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে এবং পারিবারিক তীব্র কলহের জেরে গোবিন্দ বিশ্বাস (২৮) নামে এক যুবকের মর্মান্তিক আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) সকাল ৮টার দিকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নিহত গোবিন্দ বিশ্বাস দক্ষিণ কামারগ্রামের পরিমল বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে এবং তিনি এক অবুঝ কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন।

দালালের প্রতারণা ও মালয়েশিয়ার দুঃস্বপ্ন

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩ বছর আগে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ও দালালের খপ্পরে পড়ে ভিজিট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান গোবিন্দ। সেখানে কিছুদিন চুক্তিভিত্তিক কাজ করলেও আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি চরম বিপাকে পড়েন। কোনো উপায় না দেখে প্রায় দেড় বছর পর মালয়েশিয়া পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

দেশে ফিরে এসে জীবিকা নির্বাহের জন্য বোয়ালমারী বাজারে একটি সেলুনের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে নেওয়া ঋণের বিশাল বোঝা তাঁর পিছু ছাড়েনি।

জানা গেছে, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘এসডিসি’ (SDC) থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ‘ব্র্যাক’ (BRAC) থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৬ লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।

কিস্তির তীব্র চাপ ও পারিবারিক কলহ

মালয়েশিয়া থেকে নিঃস্ব হয়ে ফেরার পর সেলুনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে ‘এসডিসি’ ও ‘ব্র্যাক’-এর মোটা অঙ্কের সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা জোগাড় করা গোবিন্দর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এনজিও কর্মীদের কিস্তির পাওনা টাকার তাগাদা ও মানসিক চাপের প্রভাব এসে পড়ত সংসারে। কিস্তি দেওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর তীব্র ঝগড়া ও মানসিক অশান্তি লেগে থাকত।

মানসিক এই বিপর্যয় সহ্য করতে না পেরে গত ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় পরিবারের লোকজনের অজান্তে নিজ ঘরে রাখা কীটনাশক পান করেন গোবিন্দ। বিষের যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকলে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে দু’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “এনজিওর ঋণের চাপ ও পারিবারিক অশান্তির জেরে এক যুবকের বিষপানে আত্মহত্যার খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে পুলিশ পাঠাই। হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানায় একটি অপমৃত্যু (UD) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”

ফরিদপুরে ঋণের চাপে যুবকের আত্মহত্যা

আপডেট সময় : ০৮:৫৩:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চড়া সুদে ঋণ তুলে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর মালয়েশিয়ায়। কিন্তু ভাগ্য ফিরেনি, উল্টো দালালের প্রতারণা আর আকামার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় দেড় বছর পর খালি হাতে, সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল তাঁকে। দেশে ফিরে পেটের দায়ে সেলুনের দোকানে কাঁচি চালিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু পিছু ছাড়েনি বিভিন্ন এনজিওর ছয় লক্ষাধিক টাকার ঋণের তড়পানি ও সাপ্তাহিক কিস্তির তাগাদা। অবশেষে এনজিওর সেই অমানবিক চাপ ও মানসিক যন্ত্রণার কাছে নতিস্বীকার করে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিলেন ফরিদপুরের বোয়ালমারীর তরুণ গোবিন্দ বিশ্বাস।

ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসদরের দক্ষিণ কামারগ্রাম ঋষিপাড়ায় এনজিওর চড়া সুদের ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে এবং পারিবারিক তীব্র কলহের জেরে গোবিন্দ বিশ্বাস (২৮) নামে এক যুবকের মর্মান্তিক আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) সকাল ৮টার দিকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। নিহত গোবিন্দ বিশ্বাস দক্ষিণ কামারগ্রামের পরিমল বিশ্বাসের একমাত্র ছেলে এবং তিনি এক অবুঝ কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন।

দালালের প্রতারণা ও মালয়েশিয়ার দুঃস্বপ্ন

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩ বছর আগে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ও দালালের খপ্পরে পড়ে ভিজিট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান গোবিন্দ। সেখানে কিছুদিন চুক্তিভিত্তিক কাজ করলেও আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি চরম বিপাকে পড়েন। কোনো উপায় না দেখে প্রায় দেড় বছর পর মালয়েশিয়া পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়ে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

দেশে ফিরে এসে জীবিকা নির্বাহের জন্য বোয়ালমারী বাজারে একটি সেলুনের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে নেওয়া ঋণের বিশাল বোঝা তাঁর পিছু ছাড়েনি।

জানা গেছে, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘এসডিসি’ (SDC) থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ‘ব্র্যাক’ (BRAC) থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৬ লক্ষাধিক টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি।

কিস্তির তীব্র চাপ ও পারিবারিক কলহ

মালয়েশিয়া থেকে নিঃস্ব হয়ে ফেরার পর সেলুনের সামান্য আয়ে সংসারের খরচ চালিয়ে ‘এসডিসি’ ও ‘ব্র্যাক’-এর মোটা অঙ্কের সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা জোগাড় করা গোবিন্দর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এনজিও কর্মীদের কিস্তির পাওনা টাকার তাগাদা ও মানসিক চাপের প্রভাব এসে পড়ত সংসারে। কিস্তি দেওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর তীব্র ঝগড়া ও মানসিক অশান্তি লেগে থাকত।

মানসিক এই বিপর্যয় সহ্য করতে না পেরে গত ৩ নভেম্বর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় পরিবারের লোকজনের অজান্তে নিজ ঘরে রাখা কীটনাশক পান করেন গোবিন্দ। বিষের যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকলে স্বজনরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটলে চিকিৎসকরা তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। সেখানে দু’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, “এনজিওর ঋণের চাপ ও পারিবারিক অশান্তির জেরে এক যুবকের বিষপানে আত্মহত্যার খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে পুলিশ পাঠাই। হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে বোয়ালমারী থানায় একটি অপমৃত্যু (UD) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।”