ফরিদপুরে মাদ্রাসার কক্ষে শিশুকে আটকে মারধর: পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার
- আপডেট সময় : ০৭:৩২:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / 69
ছোট্ট একটা ভুল—নাম ধরে ডেকে ফেলার ‘অপরাধ’। আর এই তুচ্ছ অজুহাতে ১০ বছরের একটি অবুঝ শিশুকে মাদ্রাসার চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে রেখে হাত-পা, বুক-পিঠ আর মুখে চালানো হলো পৈশাচিক নির্যাতন! মুহতামিমের ভাই ও সহযোগীদের নির্মম মারধরে যখন শিশুটির শরীর রক্তাক্ত ও নীল হয়ে গেছে, তখন চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে তাকে একটি নাপা খাইয়ে জানাজায় চলে যান কর্তাব্যক্তিরা। অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে ওই শিশুটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার একটি আবাসিক হেফজ মাদ্রাসার দশ বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে কক্ষে আটকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের শিকার ওই শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম ও নীলাফুলা দাগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে উপজেলার চাররশি এলাকার ‘আজিবুন্নেছা আন্তর্জাতিক হিজবুল কুরআন মাদ্রাসা’য় এই অমানবিক ও লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। বর্তমানে সে হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছে।
নির্যাতনের শিকার শিশু আব্দুল্লাহ (১০) সদরপুর উপজেলার দক্ষিণ আটরশি গ্রামের মো. জাহিদুল ইসলাম ও লিজা আক্তার দম্পতির ছেলে। সে ওই মাদ্রাসার আবাসিক হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করছিল।
নির্যাতনের নেপথ্য ও পরিবারের অভিযোগ
শিশুটির পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে মাদ্রাসার মুহতামিম আব্দুল করিমের ভাই মুরসালিনকে নাম ধরে ডেকে ফেলে শিশু আব্দুল্লাহ। আর এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অভিযুক্তরা।
অভিযুক্ত মুরসালিন (যিনি নগরকান্দার ভুলাদিয়া গ্রামের মিরান শেখের ছেলে) এবং মাদ্রাসার অপর তিন শিক্ষার্থী রাজিব, রায়হান ও সুজন মিলে আব্দুল্লাহকে টেনেহিঁচড়ে একটি কক্ষে আটকে রাখে। এরপর তার ওপর শুরু হয় বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন। হাত-পা, বুক, পিঠ, নাক ও মুখে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাঠিপেটা করা হয়।
মারধরের ফলে শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট বেঁধে নীলাফুলা জখম তৈরি হয়। পাশবিক এই নির্যাতনের পর শিশুটিকে কঠোরভাবে হুমকি দেওয়া হয় যেন সে এই ঘটনার কথা কাউকেও না বলে। ভয়ে ও আতঙ্কে শিশুটি তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে কিছু বলতে পারেনি।
মোদির অবহেলা ও চিকিৎসায় প্রহসন
পরিবারের অভিযোগ, আহত অবস্থায় শিশু আব্দুল্লাহকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখলেও মাদ্রাসার মুহতামিম আব্দুল করিম তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই করেননি। উল্টো তাকে কেবল একটি ‘নাপা’ ট্যাবলেট খাইয়ে তিনি একটি জানাজার নামাজে অংশ নিতে চলে যান।
পরে জানাজা শেষ করে মাদ্রাসায় ফিরে এসে শিশুটির প্রচণ্ড জ্বর দেখতে পেয়ে তবেই তার বাবা-মাকে খবর দেওয়া হয়। খবর পাওয়া মাত্রই শিশুটির মা লিজা আক্তার ও তাঁর চাচা দ্রুত মাদ্রাসায় ছুটে যান। সেখানে গিয়ে সন্তানের বিভীষিকাময় অবস্থা দেখে তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সদরপুর থানাকে অবহিত করেন।
পুলিশের তৎপরতা ও উদ্ধার অভিযান
খবর পেয়ে সদরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মেহেদী হাসান তাৎক্ষণিকভাবে ফোর্স নিয়ে মাদ্রাসায় উপস্থিত হন। তাঁর নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা নির্যাতিত শিশু আব্দুল্লাহকে উদ্ধার করে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং সেখানে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশুটির মা লিজা আক্তার বলেন, “আমার অবুঝ ছেলেকে মাদ্রাসার কক্ষে আটকে যেভাবে জানোয়ারের মতো পিটিয়ে জখম করা হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা মামলা না করতে এবং বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। আমরা এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
আইনগত ব্যবস্থা ও প্রশাসনের বক্তব্য
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ জানান, “আমরা শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি আমলে নিয়ে ইতোমধ্যে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শিশুটির ওপর যারা নির্যাতন চালিয়েছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


















