ঢাকা ০২:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

শাসক বদলায় বাংলাদেশে, বদলায় না সহিংসতার মানচিত্র

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:১৮:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • / 43

ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বহুবার, মসনদ বদল করেছে নানা দল, আর জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নির্মম চিত্র অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—তা হলো স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল—কোনো কিছুতেই থামছে না মানুষের প্রাণহানি। দলীয় সহযোদ্ধার হাতেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে নিজ দলের কর্মীকে।

নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় গত ১৮ অক্টোবর রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে একদল ব্যক্তি। স্থানীয় যুবদলের ওই নেতাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, তা নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এই একটিমাত্র ঘটনা নয়; মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধরনের স্থানীয় দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতে বিভিন্ন সরকারের আমলেই ঝরে গেছে অসংখ্য প্রাণ।

পরিসংখ্যানে রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র

আসকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি, যেগুলোতে ১৮ জন নিহত ও ১ হাজার ১২৫ জন আহত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের আমলের সমস্যা নয়। ২০০২ সাল থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই প্রবণতা বজায় রয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলেও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও শরিক দলগুলোর সঙ্গে রক্তক্ষয়ের বহু নজির রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন) কেন্দ্র করে প্রাণহানির গ্রাফ তরতর করে ওপরের দিকে উঠেছে।

আধিপত্য, টার্ফ দখল ও আর্থিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ নিয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দলীয় অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ঠিকাদারি কাজ, সম্পত্তি, জমি ও চাকরি নিয়ে বিরোধই সহিংসতার মূল কারণ। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে নেতৃত্ব ও পদ-পদবীর লড়াইয়ের মাধ্যমে স্থানীয় নেতারা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ পান। এই যোগাযোগ ব্যবহার করে আয় নিশ্চিত করা বা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হওয়ায় দলীয় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ে সাবেক ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বাজার এবং জমি দখলের লড়াইয়ে নেমে পড়ে নতুন রাজনৈতিক পক্ষের লোকজন। এর ফলে চট্টগ্রামে কৃত্রিম টার্ফ মাঠের নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের গড়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এই সহিংসতার বৃত্ত থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি; দলটির সঙ্গেও বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

সরকারের দায়বদ্ধতা ও আইনি পদক্ষেপ

চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তেছে দলটির সরকারের ওপর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় ফোরামে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। পুলিশ প্রশাসনও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার চেয়ে দলীয় বহিষ্কার বা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো লঘু পন্থার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

শাসক বদলায় বাংলাদেশে, বদলায় না সহিংসতার মানচিত্র

আপডেট সময় : ১২:১৮:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে বহুবার, মসনদ বদল করেছে নানা দল, আর জন্ম নিয়েছে নতুন রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি নির্মম চিত্র অপরিবর্তিত রয়ে গেছে—তা হলো স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকাল—কোনো কিছুতেই থামছে না মানুষের প্রাণহানি। দলীয় সহযোদ্ধার হাতেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে নিজ দলের কর্মীকে।

নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় গত ১৮ অক্টোবর রাতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে একদল ব্যক্তি। স্থানীয় যুবদলের ওই নেতাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, তা নিয়ে বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এই একটিমাত্র ঘটনা নয়; মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধরনের স্থানীয় দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাতে বিভিন্ন সরকারের আমলেই ঝরে গেছে অসংখ্য প্রাণ।

পরিসংখ্যানে রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র

আসকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি, যেগুলোতে ১৮ জন নিহত ও ১ হাজার ১২৫ জন আহত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের আমলের সমস্যা নয়। ২০০২ সাল থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকাল কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এই প্রবণতা বজায় রয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলেও অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও শরিক দলগুলোর সঙ্গে রক্তক্ষয়ের বহু নজির রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে (যেমন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন) কেন্দ্র করে প্রাণহানির গ্রাফ তরতর করে ওপরের দিকে উঠেছে।

আধিপত্য, টার্ফ দখল ও আর্থিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব

রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ নিয়ে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দলীয় অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ঠিকাদারি কাজ, সম্পত্তি, জমি ও চাকরি নিয়ে বিরোধই সহিংসতার মূল কারণ। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোতে নেতৃত্ব ও পদ-পদবীর লড়াইয়ের মাধ্যমে স্থানীয় নেতারা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ পান। এই যোগাযোগ ব্যবহার করে আয় নিশ্চিত করা বা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হওয়ায় দলীয় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ে সাবেক ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, বাজার এবং জমি দখলের লড়াইয়ে নেমে পড়ে নতুন রাজনৈতিক পক্ষের লোকজন। এর ফলে চট্টগ্রামে কৃত্রিম টার্ফ মাঠের নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এমনকি ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের গড়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এই সহিংসতার বৃত্ত থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি; দলটির সঙ্গেও বিভিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

সরকারের দায়বদ্ধতা ও আইনি পদক্ষেপ

চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তেছে দলটির সরকারের ওপর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় ফোরামে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। পুলিশ প্রশাসনও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থার চেয়ে দলীয় বহিষ্কার বা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো লঘু পন্থার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।