ফরিদপুরে একই পরিবারের ৬ জন কুপিয়ে জখম
- আপডেট সময় : ০৩:২২:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- / 349
ক্ষমতার দাপট, সুদের কারবার আর জুয়ার আসরের কুফল কীভাবে একটি গ্রামীণ জনপদকে রক্তাক্ত করে তুলতে পারে, তার এক নগ্ন ও ভয়ংকর রূপ দেখল ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়ন। রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে মধ্যকাইচাইল গ্রামে ঘটে যাওয়া এই হিংসাত্মক ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
হামলার ঘটনায় স্থানীয় নগরকান্দা থানা যুবলীগের সভাপতি হানিফ রানার (৪৮) নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল অংশ নেয় বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। যদিও এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে উল্টো প্রতিপক্ষকে দুষেছেন ওই যুবলীগ নেতা।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে তাস খেলা ও সুদের কারবার
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার মূল সূত্রপাত সুদের বিনিময়ে দেওয়া টাকা এবং তাস খেলার আসরকে কেন্দ্র করে। হানিফ রানার সমর্থক হিসেবে পরিচিত আয়ুব আলী মিয়া এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য ফজলুল হকের সমর্থক আলমগীর মিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল।
ভুক্তভোগী সুজন মিয়ার অভিযোগ, আয়ুব আলী এলাকায় তাস খেলেন এমন ব্যক্তিদের চড়া সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দিতেন। সেই চক্রে পড়ে আলমগীরও তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে সুদ দিতে দিতে আলমগীর একপর্যায়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন।
রোববার সকালে আয়ুব আলী ও তার লোকজন সুদের ওই টাকার জন্য আলমগীরকে গামছা দিয়ে বেঁধে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় ইয়ার আলী ও সুজন মিয়া বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এমনকি সেই সময় প্রতিবাদ করতে গেলে স্থানীয় চা-দোকানি মনু মিয়াকেও বেধড়ক মারধর করা হয় এবং তার হাত ভেঙে দেওয়া হয়।
রামদা ও ঢাল নিয়ে অতর্কিত তাণ্ডব
প্রাথমিক হাতাহাতির ঘটনার মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি রূপ নেয় ভয়ংকর ট্র্যাজেডিতে। রামদা, ঢাল ও শরকিসহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিতভাবে প্রতিপক্ষের বসতিতে হামলা চালানো হয়।
হামলাকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন ইয়ার আলী (৪০), সুজন মিয়া (৩৫), শিউলী বেগম (৩০), রত্না বেগম (২৫), ১৭ বছরের কিশোর ইয়ামিন এবং চা-দোকানি মনু মিয়া (৫৫)। এদের মধ্যে ইয়ার আলীর শরীরে ধারালো অস্ত্রের ছয়টি গভীর কোপ লেগেছে এবং তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হামলাকারীরা এ সময় ইয়ার আলীদের অন্তত পাঁচটি বসতঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
ঘটনার তীব্র নিন্দা ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করে ইউপি সদস্য ফজলুল হক অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা হানিফ রানার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে। তিনি অবিলম্বে এই ন্যাক্কারজনক হামলায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতারের দাবি জানান।
তবে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে যুবলীগ নেতা হানিফ রানা দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেন, “আগে আমি দল পরিচালনা করলেও বর্তমানে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মুন্নু মিয়া দল পরিচালনা করেন। মূলত আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি বলেই আমাকে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তাস বা জুয়ার টাকা নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি। বরং আয়ুব আলী ভারত থেকে আলমগীরের কাছে ৮৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন এবং সেই পাওনা টাকা ফেরত চাওয়াকেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত। এই সংঘর্ষে তাদের পক্ষের আয়ুব আলী মিয়াসহ চারজন আহত হয়ে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলেও জানান তিনি।
পুলিশের বক্তব্য
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ জানান, টাকা পাওনা ও লেনদেনকে কেন্দ্র করেই মূলত এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আহত পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া ও মামলা দায়েরের কাজ বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।











