দাওয়াত পাননি মাতুব্বর: ফরিদপুরে বলির পাঁঠা ৩০ শিশু শিক্ষার্থী
- আপডেট সময় : ০৮:১০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 186
আমন্ত্রণপত্রের সামান্য একটি কার্ড না পাওয়ার ইগো ও অহংকার যে গ্রামের শিক্ষার আলো নেভানোর অস্ত্র হতে পারে—তার এক নজিরবিহীন ও চরম বিষাদময় চিত্র দেখল ফরিদপুরের সদরপুর। নতুন স্কুল ভবন তৈরি হয়েছে, ঝকঝকে শ্রেণী কক্ষ প্রস্তুত, অথচ সেখানে ক্লাস করার মতো কোমলমতি শিশুদের দেখা নেই! কারণ একটাই—উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় তথাকথিত ‘মাতুব্বরকে’ দাওয়াত দেওয়া হয়নি। সেই ক্ষোভের চরম বলির পাঁঠা বানাতে বাধ্য করা হয়েছে নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী গ্রামের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী ও তাদের অসহায় অভিভাবকদের।
ঘটনাটি উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। মাতুব্বর কামরুল হাসানের এমন একনায়কতন্ত্র ও প্রভাবে পুরো এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা এখন চরম হুমকির মুখে।
দাওয়াত মেলেনি ঠিকাদারের তাড়াহুড়োয়, ক্ষোভ নামল শিশুদের ওপর
এলাকাবাসী ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ সেপ্টেম্বর চর চাঁদপুর কোলচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একেবারেই হঠাৎ করে এসে ফিতা কাটার আয়োজনের বিষয়টি জানায়। ফলে তাড়াহুড়োয় স্থানীয় কাউকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ মেলেনি।
কিন্তু এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকেই নিজের চরম সামাজিক অপমান বলে ধরে নেন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী মাতুব্বর কামরুল হাসান। অভিযোগ উঠেছে, এর পরপরই তিনি নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী গ্রামের অভিভাবকদের নিয়ে জরুরী বৈঠক ডাকেন এবং সন্তানদের ওই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি করার স্পষ্ট নির্দেশ দেন।
মাতুব্বরের কথার বাইরে যাওয়ার সাহস গ্রামের কারও না থাকায়, গত কয়েকদিন ধরে ওই গ্রামের প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী স্কুলে আসা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে ৭০ জনের বেশি শিশু উপস্থিত থাকত, হঠাৎ করেই তা কমে ২৫-৩০ জনে নেমে এসেছে। খাঁ খাঁ করছে শ্রেণীকক্ষ।
টিসি নেওয়ার হিড়িক ও আতঙ্কে অভিভাবকেরা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান—মাতুব্বর কামরুল হাসানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এতই বেশি যে, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সাহস তাঁদের নেই। বাধ্য হয়ে তাঁরা সন্তানদের আশপাশের স্কুলে ভর্তি করানোর চেষ্টা করছেন।
গত ১ অক্টোবর ইতোমধ্যেই ৫-৬ জন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) তুলে নিয়েছে। পার্শ্ববর্তী চর চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভগিরত সাহা নিশ্চিত করে বলেন—
“ওই বিদ্যালয় থেকে এ পর্যন্ত ২৫ থেকে ২৭ জন শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবকদের নিয়ে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে এসেছিল। তবে অফিশিয়াল টিসি না থাকায় আমরা কাউকে এখনো ভর্তি নিইনি।”
‘সব শত্রুতা!’ দাবি অভিযুক্ত মাতুব্বরের, হাত গুটিয়ে প্রশাসন
ইউপি সদস্য মো. ফরিদ হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানান, “কামরুল হাসান নছর উদ্দিন খার ডাঙ্গী এলাকার মাতুব্বর। পুরো এলাকা তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন।” তবে সমস্ত অভিযোগ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে অভিযুক্ত কামরুল হাসানের দাবি—
“আমি সরকারি চাকরির কারণে ফরিদপুর শহরে থাকি। ওই স্কুলে ভালো পড়ালেখা হয় না বলেই অভিভাবকেরা সন্তানদের সরিয়ে নিচ্ছেন। ১০ মাস পর টিসি নেওয়ার পেছনে আমার হাত রয়েছে—এমন কথা শত্রুতা করে রটানো হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী খান আক্ষেপের সঙ্গে বলেন—
“ঠিকাদারদের তাড়াহুড়োর কারণে দাওয়াত দিতে না পারার বিষয়টি আমি নিজে কামরুল হাসানকে বুঝিয়ে বলেছি। কিন্তু তিনি আমাদের কোনো কথাই শোনেননি।”
সদরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।











