পাটখেতে লাশ, ওসির হুমকি: ফরিদপুরের ইউসুফ খুনে নাম জড়াল প্রভাবশালীদের
- আপডেট সময় : ০১:০৯:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 995
নিখোঁজের দুদিন পর পাটখেতে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায় লাশ। সেদিনের সেই নির্মমতার পর কেটে গেছে আড়াইটি মাস। কিন্তু না গ্রেপ্তার হয়েছে কোনো আসামি, না মিলেছে বিচারের কোনো লক্ষণ। উল্টো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত দেওয়া হচ্ছে খুনের হুমকি! পুলিশি হয়রানি ও স্থানীয় এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার দাপটে দিশেহারা হয়ে অবশেষে অবুঝ দুই সন্তানকে পাশে বসিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডুকরে কেঁদে উঠলেন নিহত ব্যবসায়ী ইউসুফ ফকিরের স্ত্রী বেদেনা আক্তার। অভিযোগ করলেন—মামলা দায়েরের পর সাহায্য করা তো দূরের কথা, কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাদের ডেকে নিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই না করাই ভালো!”
সোমবার দুপুরে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হয়ে এমন চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক সব অভিযোগ তুলে ধরেন বেদেনা আক্তার।
হাত-পা বাঁধা লাশ ও ৫ লাখ টাকার চাঁদা-বিতর্ক
নিহত ইউসুফ ফকির সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের লোকমান খাঁর ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং মমিনখাঁর হাটে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করতেন। গত ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় অটোরিকশায় করে বাড়ির সামনে এসে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। দুদিন পর, ১৮ জুলাই সকালে বাড়ির অদূরে একটি পাটখেতে হাত-পা বাঁধা মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে দেখতে পান স্থানীয়রা। উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরদিনই কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন স্ত্রী বেদেনা। কিন্তু থানা পুলিশের নীরব ভূমিকা দেখে গত ৯ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৭ জনের নাম উল্লেখসহ হত্যা মামলা করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান আসামি হিসেবে চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম আজম (৫৮) এবং তাঁর দুই ছেলে রাব্বী বেপারি (৩২) ও রবিন বেপারির নাম উল্লেখ করা হয়। মামলার পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে বেদেনা আক্তার বলেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আসামিরা এলাকায় বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করেন। তাঁর স্বামীর কাছে মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হতো এবং এক পর্যায়ে এককালীন ৫ লাখ টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে নিখোঁজের দুদিন আগে বিএনপি নেতা আজমের সঙ্গে ইউসুফের তীব্র বাগবিতণ্ডা হয় এবং তার দুদিন পরেই আজমদের বাড়ির পেছনের পাটখেতে ইউসুফের হাত-পা বাঁধা লাশ মেলে।
ওসির হুংকার ও সিআইডির ফাইল চালাচালি
সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়ে বেদেনা অভিযোগ করেন, থানায় মামলা করার পর তদন্তের স্বার্থে ডাকার কথা বলে কোতোয়ালি থানার ওসি মাহামুদুল হাসান তাদের ডেকে নেন এবং চরম দুর্ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখান। তিনি সরাসরি বলেন, “জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই না করাই ভালো।”
এমনকি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে সোচ্চার হচ্ছেন, তাদেরও ইউসুফের মতো পরিণতি হবে বলে হুমকি দিচ্ছে আসামিপক্ষ। ১৫ বছরের ছেলে শাহাদাত ও ১০ বছরের মেয়ে ইলমাকে নিয়ে বর্তমানে জীবন বাঁচানোই দায় হয়ে পড়েছে বলে জানান অসহায় এই নারী।
এদিকে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম আজম সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, পূর্বশত্রুতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ইন্ধনে তাঁকে ও তাঁর ছেলেদের জড়ানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মাহামুদুল হাসান বাদীপক্ষকে হুমকির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানান, মামলাটি দেড় মাস আগেই সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। তবে সংবাদ সম্মেলন চলাকালেই ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে পুলিশের গোয়েন্দা টিমের হানা দেওয়া নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।











