ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেন টার্গেট হচ্ছেন তারেক রহমান?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৫১:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
  • / 342

‘এতক্ষণে-অরিন্দম কহিলা বিষাদে/জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল, রক্ষঃপুরে!’ – মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই বিখ্যাত পঙক্তি মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তিনি আট-নয় মাস আগে যে ‘অদৃশ্য শত্রুর’ কথা বলেছিলেন, সেই শত্রু এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই শক্তিই বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শনিবার (১২ জুলাই, ২০২৫) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্রদলের ১৪২ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

লন্ডন থেকে নেতৃত্ব: তারেক রহমানের অপ্রতিরোধ্য উত্থান

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ১০ হাজার মাইল দূরে লন্ডন থেকে তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কাছের নেতা হয়ে উঠেছেন। বিএনপির পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন। ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে আমজনতার চিন্তা-চেতনা ধারণ করে নিজেকে মানুষের কাতারে নিয়ে গেছেন। তারেক রহমানের এই জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক উত্থান দিল্লির দাসত্ব করা দল ও ব্যক্তিদের ‘মাথায় বাজ পড়েছে’। তারা এখন নানা প্রক্রিয়ায় তারেক রহমানকে ঠেকানো এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

ড. ইউনূসের বৈঠক ও পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের নেপথ্য কারণ

তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতৃত্বের দিকে এতদিন ভ্রুক্ষেপ করেনি ইসলামী লেবাসধারী রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লন্ডন ছুটে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক এবং যৌথ ঘোষণার পর তারা বুঝতে পারেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ‘ঠুনকো’। ড. ইউনূসের লন্ডন বৈঠকে রোজার আগের নির্বাচনের ঘোষণা পরিষ্কার করে দেয় যে দেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান ‘আন-প্যারালাল নেতা’।

তারেক রহমান এবং বিএনপিকে ঠেকাতে দিল্লির তাঁবেদার রাজনৈতিক দল, দেশি-বিদেশি শক্তি, এমনকি ইসলামী লেবাসধারী দুটি রাজনৈতিক দলও হঠাৎ করে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এই দাবির পেছনে দিল্লির নীলনকশা অনুযায়ী আগামী সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য বলে তারেক রহমান মন্তব্য করেন। একসময় তারা বুঝতে পারে, নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে দেশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং পশ্চিমা ও দিল্লির আধিপত্যবাদ কঠিন হয়ে পড়বে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও তারেক রহমান নেতৃত্বে থাকলে ভারতের আধিপত্যবাদ ‘হাওয়ায় উড়ে যাবে’ বলে তিনি জানান।

‘চাঁদাবাজের দল’ ব্র্যান্ডিং ও অপপ্রচারের রাজনীতি

তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে ‘মাইনাস’ করা গেলে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যাবে—এই ধারণায় বিশ্বাসী হয়েই নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্ব থেকে তারেক রহমানকে দূরে সরাতেই পশ্চিমা শক্তি ও দিল্লির নীলনকশা অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজের দল’ ব্র্যান্ডিংয়ের মিশন সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু করা হয়। এর জন্য ভাড়াটে ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ব্লগার, দিল্লির সেবাদাস গণমাধ্যমকর্মী ও ইসলামী লেবাসধারী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

দেশের কোথাও কোনো অঘটন ঘটলে প্রকৃত ঘটনা জানার আগেই বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নাম জুড়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ইসলামী লেবাসধারী কিছু রাজনৈতিক দল, যাদের কেউ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও কেউ ১৫ বছর ‘হাসিনার তাঁবেদারি’ করেছেন, তারা ইসলামী লেবাস নিয়েই ‘বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ’ প্রবাদের মতো দিল্লির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও ভেতরে ভেতরে দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তারই অংশ হিসেবে পুরান ঢাকার লালচাঁদ ওরফে সাগর হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলা হচ্ছে। পুরান ঢাকার যুবদল নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ওই হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতা বিএনপির ওপর দায় চাপিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডের পর দু’দিন কেন ঘটনা চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, হাজার হাজার মানুষের সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটল—সেটি সুপরিকল্পিতভাবে ভিডিও করা হলো, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন বাধা দিলো না? গত কয়েক মাসে আরও অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড ও ‘মব জাস্টিস’ ঘটেছে, সেগুলো নিয়ে তেমন প্রচারণা না চালিয়ে কেবল বিএনপি যেসব ঘটনায় জড়িত, সেগুলোই প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি বিএনপি জড়িত নয় এমন কয়েকটি ঘটনাতেও বিএনপির নাম জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হয়।

কুমিল্লার ঘটনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ড ও নীরবতার প্রশ্ন

এর আগে কুমিল্লার মুরাদনগরে প্রথমে এক হিন্দু নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। ওই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। দুটি ঘটনায় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা জড়িত এমন প্রচারণা চালায় জামায়াত, এনসিপি এবং কিছু ভাড়াটে ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও দিল্লির তাঁবেদার গণমাধ্যম। তারা যুবদলের স্থানীয় নেতা ধর্ষণ-ট্রিপল মার্ডারে জড়িত এমন প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিযোগিতায় নামে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা এবং জামায়াত অনুসারীরা এই প্রচারণা চালালেও পরে ধর্ষিত ওই নারীর স্বামী জানান, ওই উপদেষ্টার স্থানীয় অনুসারীরাই এ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম পৈশাচিক ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মোবাইল চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক অপ্রকৃতিস্থ যুবককে পেটানো হয়। প্রথমে বেঁধে রেখে এবং হলের ক্যান্টিনে জোর করে ভাত খাইয়ে পৈশাচিকভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই সময় জামায়াত, এনসিপি নীরব ছিল। অতঃপর একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ‘মব সন্ত্রাস’ প্রচার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্যকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ছাত্রদলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো নীরবতা পালন করেছে।

এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, পুরান ঢাকার লালচাঁদ ওরফে সাগর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জামায়াত-এনসিপি-ইসলামী আন্দোলনসহ দিল্লির তাঁবেদার সাংবাদিক, ইউটিউবারদের এত প্রচারণা কেন? যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না প্রশ্ন তুলেছেন, “লালচাঁদ হত্যাকাণ্ডে পুলিশ যাদের বিরুদ্ধে ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মূল আসামিদের আড়াল করা হচ্ছে; আসামির তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। ৯ জুলাই ঘটনা হঠাৎ করে ১১ জুলাই ব্যাপক প্রচার পেল কেন? আগে কেন প্রচার হয়নি? এখানে কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে?” একইভাবে অন্যরাও প্রশ্ন তুলেছেন, মামলার তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দেয়ার রহস্য কী?

বিএনপির ভেতরের ষড়যন্ত্র ও তারেক রহমানের অটল নেতৃত্ব

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির ভেতরে এখনো ভারতের তাঁবেদারি করা নেতা রয়েছেন। তারা নানাভাবে ভারত ও পতিত আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষা করছেন। কিন্তু তারেক রহমান নেতৃত্বে থাকলে তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে না। ফলে তারেক রহমানকে পশ্চিমা শক্তি ও হিন্দুত্ববাদী ভারত টার্গেট করেছে। তারেক রহমান আগামীতে বাংলাদেশের নেতৃত্বে এলে ভারতের আধিপত্যবাদ থাকবে না। এ জন্যই তারা প্রথমে সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচনের দাবিতে একাধিক দলকে মাঠে নামায়। পিআর পদ্ধতির দাবি কার্যত ‘মাঠে মারা যাওয়ায়’ এখন তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিতর্কিত করতে মাঠে নেমেছে। মূলত পিআর পদ্ধতির নির্বাচন ভারতের এজেন্ডা। যেসব দল এ দাবিতে সোচ্চার, সেগুলো পর্দার আড়ালে দিল্লির সঙ্গে সমঝোতা করে ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টায় এখনো মাঠে রয়েছে।

প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতার ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে টার্গেট করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতের হিন্দু শাখা গঠন, ইসলামী ঐক্যজোটের সমাবেশে হিন্দু নেতাদের আমন্ত্রণ – এগুলোর নেপথ্যে ছিল দিল্লির নির্দেশনা। এখন এ দলগুলো দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে টার্গেট করেছে।

দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াতের সমন্বয়ে গঠিত ২০ দলীয় জোটের শরিক ছিলেন এমন একটি দলের নেতা ইনকিলাব বলেন, “বিএনপি ১৫ বছর দুধকলা দিয়ে কালসাঁপ পোষার মতো জামায়াতকে জোটের নামে রাজনৈতিক শেল্টার দিয়েছে। জামায়াত কী জিনিস এখন সেটি বিএনপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। জার্মানির হিটলার বলেছিলেন, ‘ইহুদিরা কী জিনিস বিশ্ববাসীকে সেটি বোঝানোর জন্যই কিছু ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছি।’ একদিন ওই হিটলারের মতো হয়তো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যাবে, ‘জামায়াত কত হিংস্র ও বেইমান দেশবাসীকে তা বোঝানোর জন্যই দলটিকে নিষিদ্ধ করলেও নেতাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’”

তারেক রহমান বিগত দেড় যুগ ধরে বিদেশে থাকলেও তিনি পরিপক্ব রাজনীতিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস দেশবাসীকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে তারেক রহমান প্রতিদিন নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আওয়ামী সরকারের চরম ফ্যাসিবাদী আচরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বারবার হোঁচট খেলেও, এমনকি কয়েকজন ছাত্রনেতা গ্রেপ্তারের পর ডিবি অফিসে আন্দোলন না করার মুচলেকা দিলেও তারেক রহমান তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সাথে মন্ত্রণা দিয়ে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে এই আন্দোলনে রাজপথে সুসংগঠিত ও সম্পৃক্ত করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করতে পথ দেখান। অথচ তিনি কখনো ক্রেডিট দাবি করেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য ও তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে পরিকল্পিতভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে টার্গেট বানানো হয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে গণজোয়ার সৃষ্টি হবে। ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ তাকে বরণ করে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই তাকে টার্গেট করা হচ্ছে। ভারতের নীলনকশায় আওয়ামী লীগকে সংসদে পুনর্বাসনের চেষ্টারত বিএনপিবিরোধীরা যেমন চাচ্ছে না তারেক রহমান দেশে ফিরুক; তেমনি বিএনপির ভেতরে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীও চাচ্ছে না তিনি দেশে এসে শক্তভাবে দলের হাল ধরুক। পরিকল্পিতভাবেই টার্গেট বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও তার বিরুদ্ধে রীতিমতো নোংরা ক্যাম্পেইন চলছে। তার নেতৃত্ব ধ্বংস করাই যেন এর মূল টার্গেট। দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঠিকাদারী নেওয়া দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় কথিত ইউটিউবার, ভুঁইফোড় কিছু চ্যানেল টানা প্রোপাগান্ডা, অপপ্রচার ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারেক রহমানকে নিয়ে অত্যন্ত নোংরাভাবে টার্গেট করে কুৎসা রটানো হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্যাডারভিত্তিক একটি ইসলামী লেবাসধারী দলের প্রত্যক্ষ মদদে তারেক রহমানবিরোধী এ প্রচারণা জোরেশোরে চালানো হচ্ছে। এর পেছনে ‘পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের অবৈধ পয়সা ঢালা হচ্ছে’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানকে টার্গেট করা হলেও তাকে ধরাশায়ী করা কঠিন হবে। কারণ তিনি হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়ে যেভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, কোনো ষড়যন্ত্র সেটিকে ভাঙতে পারবে না।

শহীদদের বিচার ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের অঙ্গীকার

তারেক রহমান বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বহু নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। বিএনপি ছাড়াও অনেক দলের নেতাকর্মী এবং নিরপেক্ষ অনেক মানুষও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আগামীতে বিএনপি দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে অবশ্যই এসব হত্যার বিচার সুষ্ঠুভাবে হবে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবে বিএনপি।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে যে মানুষগুলো প্রাণ দিয়েছেন, গণতন্ত্রের কণ্ঠকে রোধ করার জন্য যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, সেই হত্যার বিচারগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তার সর্বোচ্চ উদ্যোগ বিএনপির থাকবে।”

তারেক রহমান বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি দেশকে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে ভেঙে চুড়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি—দেশকে যদি গড়তে হয় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এ ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সব প্রকার উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি।

জুলাই সনদ ও সরকারের প্রতি প্রশ্ন

‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান জানিয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, তিন মাস আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে লিখিত আকারে তাদের কথাগুলো জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেকে বিচারের কথা বলেছেন। বিচারের কথা শুধু আপনাদের কথা না—বিচারের কথা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের দাবি। প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের কথা। বিএনপি যখনই সুযোগ পাবে অবশ্যই প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। কারণ এটি আমাদের কমিটমেন্ট।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে বাইরে কথা বলেছি। কিন্তু সরকার থেকে কেন বলছে না—জুলাই সনদের ব্যাপারে বিএনপি তিন মাস আগেই জানিয়ে দিয়েছে। কেন বলছে না? কেন কিছু কিছু দল পুরা বিষয়টিকে ভ্রান্তভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে?”

মির্জা ফখরুলের আহ্বান ও আবেগঘন পরিবেশ

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, যে ঘটনাগুলো ঘটছে সরকারকে আহ্বান জানাব, অতিদ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত যারা অপরাধীদের বের করে শান্তির ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় জাতি আপনাদের ক্ষমা করবে না।” তিনি ত্যাগ স্বীকারকারী নেতাকর্মীদের ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানান। মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপি কোনোদিন কোনো অন্যায়কে সমর্থন করেনি। বিএনপি কখনো করবে না। বিএনপি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অতীতেও করেছে এবং এবারও করবে।”

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বক্তব্য রাখেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে কক্সবাজার, বরিশাল, ঢাকা (কাফরুল), ভোলা, টাঙ্গাইল, মাগুরা, নোয়াখালী, নরসিংদী ও দিনাজপুরের শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণকালে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবসহ উপস্থিত জনতার চোখেও পানি চলে আসে।

কেন টার্গেট হচ্ছেন তারেক রহমান?

আপডেট সময় : ১২:৫১:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫

‘এতক্ষণে-অরিন্দম কহিলা বিষাদে/জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল, রক্ষঃপুরে!’ – মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই বিখ্যাত পঙক্তি মনে করিয়ে দিয়ে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তিনি আট-নয় মাস আগে যে ‘অদৃশ্য শত্রুর’ কথা বলেছিলেন, সেই শত্রু এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই শক্তিই বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।

শনিবার (১২ জুলাই, ২০২৫) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্রদলের ১৪২ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

লন্ডন থেকে নেতৃত্ব: তারেক রহমানের অপ্রতিরোধ্য উত্থান

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে ১০ হাজার মাইল দূরে লন্ডন থেকে তিনি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের কাছের নেতা হয়ে উঠেছেন। বিএনপির পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত ভার্চুয়ালি মতবিনিময় করেন। ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশে আমজনতার চিন্তা-চেতনা ধারণ করে নিজেকে মানুষের কাতারে নিয়ে গেছেন। তারেক রহমানের এই জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক উত্থান দিল্লির দাসত্ব করা দল ও ব্যক্তিদের ‘মাথায় বাজ পড়েছে’। তারা এখন নানা প্রক্রিয়ায় তারেক রহমানকে ঠেকানো এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন।

ড. ইউনূসের বৈঠক ও পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের নেপথ্য কারণ

তারেক রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতৃত্বের দিকে এতদিন ভ্রুক্ষেপ করেনি ইসলামী লেবাসধারী রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লন্ডন ছুটে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক এবং যৌথ ঘোষণার পর তারা বুঝতে পারেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ‘ঠুনকো’। ড. ইউনূসের লন্ডন বৈঠকে রোজার আগের নির্বাচনের ঘোষণা পরিষ্কার করে দেয় যে দেশের রাজনীতিতে তারেক রহমান ‘আন-প্যারালাল নেতা’।

তারেক রহমান এবং বিএনপিকে ঠেকাতে দিল্লির তাঁবেদার রাজনৈতিক দল, দেশি-বিদেশি শক্তি, এমনকি ইসলামী লেবাসধারী দুটি রাজনৈতিক দলও হঠাৎ করে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এই দাবির পেছনে দিল্লির নীলনকশা অনুযায়ী আগামী সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য বলে তারেক রহমান মন্তব্য করেন। একসময় তারা বুঝতে পারে, নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর নির্বাচিত সরকার গঠিত হলে দেশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং পশ্চিমা ও দিল্লির আধিপত্যবাদ কঠিন হয়ে পড়বে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলেও তারেক রহমান নেতৃত্বে থাকলে ভারতের আধিপত্যবাদ ‘হাওয়ায় উড়ে যাবে’ বলে তিনি জানান।

‘চাঁদাবাজের দল’ ব্র্যান্ডিং ও অপপ্রচারের রাজনীতি

তারেক রহমানকে নেতৃত্ব থেকে ‘মাইনাস’ করা গেলে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যাবে—এই ধারণায় বিশ্বাসী হয়েই নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্ব থেকে তারেক রহমানকে দূরে সরাতেই পশ্চিমা শক্তি ও দিল্লির নীলনকশা অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজের দল’ ব্র্যান্ডিংয়ের মিশন সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু করা হয়। এর জন্য ভাড়াটে ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ব্লগার, দিল্লির সেবাদাস গণমাধ্যমকর্মী ও ইসলামী লেবাসধারী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

দেশের কোথাও কোনো অঘটন ঘটলে প্রকৃত ঘটনা জানার আগেই বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের নাম জুড়ে দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ইসলামী লেবাসধারী কিছু রাজনৈতিক দল, যাদের কেউ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও কেউ ১৫ বছর ‘হাসিনার তাঁবেদারি’ করেছেন, তারা ইসলামী লেবাস নিয়েই ‘বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ’ প্রবাদের মতো দিল্লির বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও ভেতরে ভেতরে দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তারই অংশ হিসেবে পুরান ঢাকার লালচাঁদ ওরফে সাগর হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলা হচ্ছে। পুরান ঢাকার যুবদল নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ওই হত্যাকাণ্ডের বীভৎসতা বিএনপির ওপর দায় চাপিয়ে তুলে ধরা হচ্ছে।

তবে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ওই হত্যাকাণ্ডের পর দু’দিন কেন ঘটনা চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, হাজার হাজার মানুষের সামনে হত্যাকাণ্ড ঘটল—সেটি সুপরিকল্পিতভাবে ভিডিও করা হলো, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন বাধা দিলো না? গত কয়েক মাসে আরও অনেকগুলো হত্যাকাণ্ড ও ‘মব জাস্টিস’ ঘটেছে, সেগুলো নিয়ে তেমন প্রচারণা না চালিয়ে কেবল বিএনপি যেসব ঘটনায় জড়িত, সেগুলোই প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি বিএনপি জড়িত নয় এমন কয়েকটি ঘটনাতেও বিএনপির নাম জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হয়।

কুমিল্লার ঘটনা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ড ও নীরবতার প্রশ্ন

এর আগে কুমিল্লার মুরাদনগরে প্রথমে এক হিন্দু নারীকে ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। ওই ঘটনা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। দুটি ঘটনায় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা জড়িত এমন প্রচারণা চালায় জামায়াত, এনসিপি এবং কিছু ভাড়াটে ইউটিউবার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও দিল্লির তাঁবেদার গণমাধ্যম। তারা যুবদলের স্থানীয় নেতা ধর্ষণ-ট্রিপল মার্ডারে জড়িত এমন প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিযোগিতায় নামে। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা এবং জামায়াত অনুসারীরা এই প্রচারণা চালালেও পরে ধর্ষিত ওই নারীর স্বামী জানান, ওই উপদেষ্টার স্থানীয় অনুসারীরাই এ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম পৈশাচিক ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। মোবাইল চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক অপ্রকৃতিস্থ যুবককে পেটানো হয়। প্রথমে বেঁধে রেখে এবং হলের ক্যান্টিনে জোর করে ভাত খাইয়ে পৈশাচিকভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই সময় জামায়াত, এনসিপি নীরব ছিল। অতঃপর একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ‘মব সন্ত্রাস’ প্রচার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্যকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ছাত্রদলের এক নেতাকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো নীরবতা পালন করেছে।

এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, পুরান ঢাকার লালচাঁদ ওরফে সাগর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জামায়াত-এনসিপি-ইসলামী আন্দোলনসহ দিল্লির তাঁবেদার সাংবাদিক, ইউটিউবারদের এত প্রচারণা কেন? যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না প্রশ্ন তুলেছেন, “লালচাঁদ হত্যাকাণ্ডে পুলিশ যাদের বিরুদ্ধে ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মূল আসামিদের আড়াল করা হচ্ছে; আসামির তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দেয়া হয়েছে। ৯ জুলাই ঘটনা হঠাৎ করে ১১ জুলাই ব্যাপক প্রচার পেল কেন? আগে কেন প্রচার হয়নি? এখানে কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে?” একইভাবে অন্যরাও প্রশ্ন তুলেছেন, মামলার তালিকা থেকে তিনজনের নাম বাদ দেয়ার রহস্য কী?

বিএনপির ভেতরের ষড়যন্ত্র ও তারেক রহমানের অটল নেতৃত্ব

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির ভেতরে এখনো ভারতের তাঁবেদারি করা নেতা রয়েছেন। তারা নানাভাবে ভারত ও পতিত আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষা করছেন। কিন্তু তারেক রহমান নেতৃত্বে থাকলে তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে না। ফলে তারেক রহমানকে পশ্চিমা শক্তি ও হিন্দুত্ববাদী ভারত টার্গেট করেছে। তারেক রহমান আগামীতে বাংলাদেশের নেতৃত্বে এলে ভারতের আধিপত্যবাদ থাকবে না। এ জন্যই তারা প্রথমে সংসদে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচনের দাবিতে একাধিক দলকে মাঠে নামায়। পিআর পদ্ধতির দাবি কার্যত ‘মাঠে মারা যাওয়ায়’ এখন তারেক রহমানের নেতৃত্ব বিতর্কিত করতে মাঠে নেমেছে। মূলত পিআর পদ্ধতির নির্বাচন ভারতের এজেন্ডা। যেসব দল এ দাবিতে সোচ্চার, সেগুলো পর্দার আড়ালে দিল্লির সঙ্গে সমঝোতা করে ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টায় এখনো মাঠে রয়েছে।

প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতার ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে টার্গেট করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। জামায়াতের হিন্দু শাখা গঠন, ইসলামী ঐক্যজোটের সমাবেশে হিন্দু নেতাদের আমন্ত্রণ – এগুলোর নেপথ্যে ছিল দিল্লির নির্দেশনা। এখন এ দলগুলো দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নে তারেক রহমানকে টার্গেট করেছে।

দীর্ঘদিন বিএনপি-জামায়াতের সমন্বয়ে গঠিত ২০ দলীয় জোটের শরিক ছিলেন এমন একটি দলের নেতা ইনকিলাব বলেন, “বিএনপি ১৫ বছর দুধকলা দিয়ে কালসাঁপ পোষার মতো জামায়াতকে জোটের নামে রাজনৈতিক শেল্টার দিয়েছে। জামায়াত কী জিনিস এখন সেটি বিএনপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। জার্মানির হিটলার বলেছিলেন, ‘ইহুদিরা কী জিনিস বিশ্ববাসীকে সেটি বোঝানোর জন্যই কিছু ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছি।’ একদিন ওই হিটলারের মতো হয়তো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যাবে, ‘জামায়াত কত হিংস্র ও বেইমান দেশবাসীকে তা বোঝানোর জন্যই দলটিকে নিষিদ্ধ করলেও নেতাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।’”

তারেক রহমান বিগত দেড় যুগ ধরে বিদেশে থাকলেও তিনি পরিপক্ব রাজনীতিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাস দেশবাসীকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে তারেক রহমান প্রতিদিন নিবিড়ভাবে তত্ত্বাবধান করেছেন এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আওয়ামী সরকারের চরম ফ্যাসিবাদী আচরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বারবার হোঁচট খেলেও, এমনকি কয়েকজন ছাত্রনেতা গ্রেপ্তারের পর ডিবি অফিসে আন্দোলন না করার মুচলেকা দিলেও তারেক রহমান তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দক্ষতার সাথে মন্ত্রণা দিয়ে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলকে এই আন্দোলনে রাজপথে সুসংগঠিত ও সম্পৃক্ত করেন এবং গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করতে পথ দেখান। অথচ তিনি কখনো ক্রেডিট দাবি করেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য ও তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে পরিকল্পিতভাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে টার্গেট বানানো হয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে গণজোয়ার সৃষ্টি হবে। ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ তাকে বরণ করে নেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি যখন দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই তাকে টার্গেট করা হচ্ছে। ভারতের নীলনকশায় আওয়ামী লীগকে সংসদে পুনর্বাসনের চেষ্টারত বিএনপিবিরোধীরা যেমন চাচ্ছে না তারেক রহমান দেশে ফিরুক; তেমনি বিএনপির ভেতরে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীও চাচ্ছে না তিনি দেশে এসে শক্তভাবে দলের হাল ধরুক। পরিকল্পিতভাবেই টার্গেট বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও তার বিরুদ্ধে রীতিমতো নোংরা ক্যাম্পেইন চলছে। তার নেতৃত্ব ধ্বংস করাই যেন এর মূল টার্গেট। দিল্লির এজেন্ডা বাস্তবায়নের ঠিকাদারী নেওয়া দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় কথিত ইউটিউবার, ভুঁইফোড় কিছু চ্যানেল টানা প্রোপাগান্ডা, অপপ্রচার ও অপতথ্য ছড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তারেক রহমানকে নিয়ে অত্যন্ত নোংরাভাবে টার্গেট করে কুৎসা রটানো হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্যাডারভিত্তিক একটি ইসলামী লেবাসধারী দলের প্রত্যক্ষ মদদে তারেক রহমানবিরোধী এ প্রচারণা জোরেশোরে চালানো হচ্ছে। এর পেছনে ‘পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের অবৈধ পয়সা ঢালা হচ্ছে’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানকে টার্গেট করা হলেও তাকে ধরাশায়ী করা কঠিন হবে। কারণ তিনি হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বিচক্ষণতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখিয়ে যেভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন, কোনো ষড়যন্ত্র সেটিকে ভাঙতে পারবে না।

শহীদদের বিচার ও ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের অঙ্গীকার

তারেক রহমান বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বহু নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। বিএনপি ছাড়াও অনেক দলের নেতাকর্মী এবং নিরপেক্ষ অনেক মানুষও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আগামীতে বিএনপি দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে অবশ্যই এসব হত্যার বিচার সুষ্ঠুভাবে হবে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবে বিএনপি।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে যে মানুষগুলো প্রাণ দিয়েছেন, গণতন্ত্রের কণ্ঠকে রোধ করার জন্য যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, সেই হত্যার বিচারগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তার সর্বোচ্চ উদ্যোগ বিএনপির থাকবে।”

তারেক রহমান বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি দেশকে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে ভেঙে চুড়ে ছারখার করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি—দেশকে যদি গড়তে হয় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এ ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সব প্রকার উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করেছি।

জুলাই সনদ ও সরকারের প্রতি প্রশ্ন

‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান জানিয়ে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, তিন মাস আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে লিখিত আকারে তাদের কথাগুলো জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেকে বিচারের কথা বলেছেন। বিচারের কথা শুধু আপনাদের কথা না—বিচারের কথা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের দাবি। প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের কথা। বিএনপি যখনই সুযোগ পাবে অবশ্যই প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। কারণ এটি আমাদের কমিটমেন্ট।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “জুলাই সনদ নিয়ে বাইরে কথা বলেছি। কিন্তু সরকার থেকে কেন বলছে না—জুলাই সনদের ব্যাপারে বিএনপি তিন মাস আগেই জানিয়ে দিয়েছে। কেন বলছে না? কেন কিছু কিছু দল পুরা বিষয়টিকে ভ্রান্তভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে?”

মির্জা ফখরুলের আহ্বান ও আবেগঘন পরিবেশ

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, যে ঘটনাগুলো ঘটছে সরকারকে আহ্বান জানাব, অতিদ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত যারা অপরাধীদের বের করে শান্তির ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় জাতি আপনাদের ক্ষমা করবে না।” তিনি ত্যাগ স্বীকারকারী নেতাকর্মীদের ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানান। মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপি কোনোদিন কোনো অন্যায়কে সমর্থন করেনি। বিএনপি কখনো করবে না। বিএনপি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অতীতেও করেছে এবং এবারও করবে।”

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বক্তব্য রাখেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে কক্সবাজার, বরিশাল, ঢাকা (কাফরুল), ভোলা, টাঙ্গাইল, মাগুরা, নোয়াখালী, নরসিংদী ও দিনাজপুরের শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণকালে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবসহ উপস্থিত জনতার চোখেও পানি চলে আসে।