অদৃশ্য শত্রু দৃশ্যমান হচ্ছে: তারেক রহমান
- আপডেট সময় : ০১:২০:২০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ জুলাই ২০২৫
- / 281
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মন্তব্য করেছেন যে, তিনি আট-নয় মাস আগে যে ‘অদৃশ্য শত্রুর’ কথা বলেছিলেন, সেই শত্রু এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। এই শক্তিই দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং মানুষের অধিকারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও জনগণের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। শনিবার (১২ জুলাই, ২০২৫) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছাত্রদলের ১৪২ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি: ‘মব’ কালচার ও সরকারের ভূমিকা
শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তারেক রহমান তাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন এবং শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। ‘মব’ কালচার প্রসঙ্গে এক শহীদের বাবার প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, দেশের গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র ছিল, স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করা হলেও সেই ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি।
তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বারবার বলেছেন যে, অন্যায়কারী যেই হোক, বিএনপি তাকে প্রশ্রয় দেবে না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সরকার কেন ব্যর্থ হচ্ছে? এ সরকারের কাছে আমাদের সবার প্রশ্ন, তারা কেন প্রশ্রয় দিচ্ছে, আশ্রয় দিচ্ছে?”
সোহাগ হত্যাকাণ্ড: ন্যায়বিচার ও প্রশাসনের ভূমিকা
মিটফোর্ডের সোহাগ হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, “যে ঘটনাটি ঘটেছে—আমরা খুব আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি। স্ক্রিনে যাকে হত্যা করতে দেখা গেছে—তাকে কেন সরকার এখনো গ্রেপ্তার করেনি? আমরা কি তাহলে ধরে নেব—যারা বিভিন্নভাবে মব সৃষ্টি করে একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, সেখানে সরকার এবং প্রশাসনের প্রশ্রয় আছে?”
তিনি আরও বলেন, পুরোনো ঢাকায় যে ঘটনাটি ঘটে গেছে, “যে ছেলেটি মারা গেছে বরঞ্চ তার সঙ্গে হয়তো যুবদলের সম্পর্ক আছে। কিন্তু যে খুন করছে বা যে হত্যা করছে—তাকে তো অন্য জায়গা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে ধরা হচ্ছে না। অন্যদের গ্রেপ্তার করা হলো। এখন পর্যন্ত আসামিও বোধহয় করা হয়নি। কেন হয়নি? কেন ধরা হচ্ছে না?” তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, বিএনপি কখনোই বলেনি যে অমুককে ধরা যাবে না বা অমুক ধরা যাবে। “আমরা বরাবর বলেছি, অন্যায়কারীর আইনের দৃষ্টিতে বিচার হবে। দলের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। তাকে দল কোনোরকম প্রশ্রয় দেবে না। কেউ যদি কোনো অন্যায় করে থাকে তাহলে প্রশাসন ধরছে না কেন?”
‘আবারো সোচ্চার হতে হবে’: দেশ ও প্রশাসনের প্রতি বার্তা
একটি রাজনৈতিক দলের দিকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করা হলে কিছু নন-ইস্যু সামনে আনা হয়। তিনি বলেন, “দেশ কারো একার নয়, এটা ২০ কোটি মানুষের। দেশ রক্ষা করতে হবে, দেশ নিয়ে সবার ভাবতে হবে। স্বৈরাচার বিদায় হলেও ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে যায়নি।” তিনি সবাইকে দেশ নিয়ে ভাবতে এবং ষড়যন্ত্রের দিকে নজর রাখতে আহ্বান জানান। তারেক রহমান ৭১, ৯০ ও ২৪-এর মতো আবারও সোচ্চার হওয়ার ডাক দিয়ে বলেন, “কারা কী বলছে, আগে কী বলছে, ক্ষণে ক্ষণে কী বলছে, এটায় নজর রাখুন।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “প্রশাসনের মধ্যে এখনো স্বৈরাচারের ভূত লুকিয়ে আছে। এখনো নতুন ভূত জন্ম হচ্ছে। সবাইকে বলব সচেতন হোন; না হয় দেশকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।” বিএনপি ঘোষণা দেয়, অন্যায়কারী যেই হোক, কোনো প্রশ্রয় দেবে না। আগামী দিনে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে মানুষের অধিকার রক্ষায় যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করার তাগিদ থাকবে বিএনপির।
শহীদদের বিচার ও জুলাই সনদ
শহীদদের বিচারের ব্যাপারে তারেক রহমান বলেন, গত ১৫-১৬ বছরে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের বহু নেতাকর্মী শহীদ হয়েছেন। বিএনপি ছাড়াও অনেক দলের নেতাকর্মী এবং নিরপেক্ষ মানুষও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তিনি অঙ্গীকার করেন, “আগামীতে বিএনপি দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে অবশ্যই এসব হত্যার বিচার সুষ্ঠুভাবে হবে। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবে বিএনপি।”
‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, তিন মাস আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে লিখিত আকারে তাদের কথা জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেকে বিচারের কথা বলেছেন। বিচারের কথা শুধু আপনাদের কথা না—বিচারের কথা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক মানুষের দাবি।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার কেন জুলাই সনদের ব্যাপারে কথা বলছে না এবং কিছু কিছু দল কেন পুরো বিষয়টিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে।
মির্জা ফখরুলের আহ্বান ও শহীদ পরিবারের আবেগঘন মুহূর্ত
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “যে ঘটনাগুলো ঘটছে সরকারকে আহ্বান জানাব, অতিদ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত যারা অপরাধীদের বের করে শান্তির ব্যবস্থা করুন। অন্যথায় জাতি আপনাদের ক্ষমা করবে না।” তিনি ত্যাগ স্বীকারকারী নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানান। মির্জা ফখরুল বলেন, “বিএনপি কোনোদিন কোনো অন্যায়কে সমর্থন করেনি। বিএনপি কখনো করবে না। বিএনপি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অতীতেও করেছে এবং এবারও করবে।”
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বক্তব্য রাখেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে কক্সবাজার, বরিশাল, ঢাকা (কাফরুল), ভোলা, টাঙ্গাইল, মাগুরা, নোয়াখালী, নরসিংদী ও দিনাজপুরের শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য রাখেন। শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণকালে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল এবং উপস্থিত জনতার চোখেও পানি দেখা যায়।















