ভেঙে গেল উত্তরের দুর্গ: তারেক রহমানের শুদ্ধি অভিযানে লণ্ডভণ্ড
- আপডেট সময় : ০৫:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 170
অপরাধী যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন, রাজনৈতিক বা সরকারি পরিচয় এখন আর সুরক্ষাকবচ নয়! দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অনিয়মে জড়ানো নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কঠোর ‘লাইন অব অ্যাকশন’ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন শেষে দেশে ফিরেই রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-লুটপাটের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। এর পরই তিন দিনের মাথায় বুধবার রাত থেকে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব সাংগঠনিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক—যার ধাক্কায় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে প্রভাবশালী নেতাদের রাজনৈতিক দুর্গ।
বুধবার রাতেই ভেঙে দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির হাইপ্রোফাইল কমিটি। এর রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার সকালে জানা যায়, শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি তাঁর পদত্যাগপত্র নিয়ে সংসদের উদ্দেশ্যে ছুটছেন। দুপুরের মধ্যে খবরটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রূপ নেয়।
মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও আমূল অ্যাকশন
সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর ঘটনার পুরো বিবরণ শোনেন এবং বিস্তারিত তদন্তের নির্দেশ দেন।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলতেই বুধবার মিষ্টিসহ মহানগর উত্তরের নেতাদের নিজ কার্যালয়ে তলব করেন তারেক রহমান। বৈঠকে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তাৎক্ষণিকভাবে মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কড়া নির্দেশ দেন তিনি। একই সাথে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি, উত্তর যুবদল এবং পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি। যুবদল ও ছাত্রদল অবশ্য মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুনর্গঠনের কথা বললেও এই অ্যাকশন যে রাড্ডা কাণ্ডের সরাসরি ফল, তা স্পষ্ট।
নজরদারিতে মন্ত্রী-এমপিরা, রেড অ্যালার্টে সুবিধাবাদীরা
বিএনপির দলীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই শুদ্ধি অভিযান কেবল পদত্যাগে আটকে থাকছে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দলীয় কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে যৌথভাবে একটি ‘বিতর্কিত তালিকা’ প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এলাকায় দখলদারি, কোন্দল ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে অন্তত চারজন প্রতিমন্ত্রীর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছে এবং তাঁদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন—
“বিএনপি দেশ ও জনগণের জন্য রাজনীতি করে। সেখানে কেউ বিশৃঙ্খলা করলে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের দলের কিছু উচ্চাভিলাষী নেতাকর্মী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছিল, তাই চেয়ারম্যান তারেক রহমান চরম কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অপরাধীর কোনো পরিচয় দেখা হবে না।”
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল একই সুর মিলিয়ে জানান, বিচার বিভাগ ও আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিএনপি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় আটক করা হয়েছে মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে সসম্মানে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
শুদ্ধির বার্তা তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত
বিএনপির দলীয় হিসাবমতে, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে নির্বাচন ও সরকার গঠনের ধারাবাহিকতায় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, পদ স্থগিত ও অব্যাহতির মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল পুনর্গঠন ও ক্লিন ইমেজ ধরে রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের ভাবমূর্তি কোনো ব্যক্তির অপকর্মের জন্য ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না—তারেক রহমানের এই আপসহীন অবস্থানে যেখানে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, ঠিক তেমনই সাধারণ জনগণের মধ্যেও তৈরি হয়েছে তুমুল ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া।















