ঢাকা ০১:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে রেল প্রকল্প স্থগিত: ভারতের কৌশল বদলের বার্তা কী?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:১৩:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫
  • / 356

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অবকাঠামো ভিত্তিক সংযোগ প্রকল্পগুলোর সাময়িক স্থগিতকরণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেলপথে এই সংযোগ সম্প্রসারণ কেবলমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি আঞ্চলিক কূটনীতির একটি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত।

ভারত এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল। এতে করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ‘সিলিগুড়ি করিডোর’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো যেত।

🔹 প্রকল্প ও ভারতীয় বিনিয়োগ

এই লক্ষ্য পূরণে ভারত প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপির রেল প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে আখাউড়া-আগরতলা, খুলনা-মোংলা এবং ঢাকা-জয়দেবপুর রেল প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু হঠাৎ করেই ভারত এই প্রকল্পগুলো স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে, যা দিল্লি থেকে ঢাকাগামী উন্নয়নের রেলগাড়িকে আপাতত থামিয়ে দিয়েছে।

ভারত সরকারের মতে, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগের কারণেই এই স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছে।

🔹 স্থগিত হওয়া প্রকল্পগুলো

এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলছে তিনটি বড় প্রকল্প ও পাঁচটি সম্ভাব্য রুটের জরিপ কাজের ওপর। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হলো:

  • আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ: ভারত সরকারের অনুদানে ১২.২৪ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথের ৬.৭৮ কিমি বাংলাদেশ অংশে অবস্থিত।

  • খুলনা-মোংলা রেলপথ: প্রায় ৩,৩০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প মোংলা বন্দরকে দেশের মূল রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল।

  • ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেল সম্প্রসারণ: প্রায় ১,৬০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সহায়তায় চলছিল, তবে অগ্রগতি আশানুরূপ ছিল না।

🔹 ভারতের কূটনৈতিক বার্তা

ভারত এই সিদ্ধান্তকে একটি সাময়িক, নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, এর কূটনৈতিক বার্তা খুবই স্পষ্ট: বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উন্নয়ন কার্যক্রম এগোবে না।

🔹 বিকল্প খুঁজছে ভারত

ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বিকল্প রেল যোগাযোগের জন্য এখন ভুটান ও নেপালের দিকে তাকাচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় রয়েছে:

  • বিহার ও উত্তর প্রদেশে রেলপথের দ্বিগুণ ও চতুর্মাত্রিকীকরণ।

  • বিরাটনগর-নিউ মাল (১৯০ কিমি) এবং গলগলিয়া-ভদ্রপুর-কাজলি বাজার (১২.৫ কিমি) রুটে নেপাল-ভারত সংযোগ।

  • কুমেদপুর-আমবাড়ি ফালাকাটা (১৭০ কিমি) এবং পশ্চিমবঙ্গ-বিহার সংযোগে নতুন রেলপথ নির্মাণ।

🔹 বাংলাদেশের জন্য বার্তা

বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে চলমান বিতর্ক দিল্লির আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। ভারতের ‘এক দেশ, বহু বিকল্প’ নীতির প্রকাশ ঘটছে এই সিদ্ধান্তে।

এই স্থগিতাদেশ বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিকভাবে অস্বস্তিকর। ভারতের সহায়তায় নির্মীয়মাণ পরিকাঠামো প্রকল্পগুলো কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহণ ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আনতে পারতো। মোংলা বন্দরকে খুলনার মাধ্যমে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার ফলে বাংলাদেশ রাজস্ব উপার্জন করতে পারতো, যা এখন অনিশ্চিত।

🔹 চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা

ভারতের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে এখন আঞ্চলিক কৌশল ও কূটনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।

দ্য হিন্দু বিজনেস লাইনের প্রতিবেদন

বাংলাদেশে রেল প্রকল্প স্থগিত: ভারতের কৌশল বদলের বার্তা কী?

আপডেট সময় : ১২:১৩:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ এপ্রিল ২০২৫

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অবকাঠামো ভিত্তিক সংযোগ প্রকল্পগুলোর সাময়িক স্থগিতকরণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রেলপথে এই সংযোগ সম্প্রসারণ কেবলমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি আঞ্চলিক কূটনীতির একটি কৌশল হিসেবেও বিবেচিত।

ভারত এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিল। এতে করে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ‘সিলিগুড়ি করিডোর’-এর ওপর নির্ভরতা কমানো যেত।

🔹 প্রকল্প ও ভারতীয় বিনিয়োগ

এই লক্ষ্য পূরণে ভারত প্রায় ৫,০০০ কোটি রুপির রেল প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে আখাউড়া-আগরতলা, খুলনা-মোংলা এবং ঢাকা-জয়দেবপুর রেল প্রকল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কিন্তু হঠাৎ করেই ভারত এই প্রকল্পগুলো স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে, যা দিল্লি থেকে ঢাকাগামী উন্নয়নের রেলগাড়িকে আপাতত থামিয়ে দিয়েছে।

ভারত সরকারের মতে, বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভারতীয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগের কারণেই এই স্থগিতাদেশ নেওয়া হয়েছে।

🔹 স্থগিত হওয়া প্রকল্পগুলো

এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলছে তিনটি বড় প্রকল্প ও পাঁচটি সম্ভাব্য রুটের জরিপ কাজের ওপর। উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলো হলো:

  • আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগ: ভারত সরকারের অনুদানে ১২.২৪ কিমি দীর্ঘ এই রেলপথের ৬.৭৮ কিমি বাংলাদেশ অংশে অবস্থিত।

  • খুলনা-মোংলা রেলপথ: প্রায় ৩,৩০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প মোংলা বন্দরকে দেশের মূল রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার কথা ছিল।

  • ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেল সম্প্রসারণ: প্রায় ১,৬০০ কোটি রুপির এই প্রকল্প ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সহায়তায় চলছিল, তবে অগ্রগতি আশানুরূপ ছিল না।

🔹 ভারতের কূটনৈতিক বার্তা

ভারত এই সিদ্ধান্তকে একটি সাময়িক, নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, এর কূটনৈতিক বার্তা খুবই স্পষ্ট: বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উন্নয়ন কার্যক্রম এগোবে না।

🔹 বিকল্প খুঁজছে ভারত

ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সঙ্গে বিকল্প রেল যোগাযোগের জন্য এখন ভুটান ও নেপালের দিকে তাকাচ্ছে। নতুন পরিকল্পনায় রয়েছে:

  • বিহার ও উত্তর প্রদেশে রেলপথের দ্বিগুণ ও চতুর্মাত্রিকীকরণ।

  • বিরাটনগর-নিউ মাল (১৯০ কিমি) এবং গলগলিয়া-ভদ্রপুর-কাজলি বাজার (১২.৫ কিমি) রুটে নেপাল-ভারত সংযোগ।

  • কুমেদপুর-আমবাড়ি ফালাকাটা (১৭০ কিমি) এবং পশ্চিমবঙ্গ-বিহার সংযোগে নতুন রেলপথ নির্মাণ।

🔹 বাংলাদেশের জন্য বার্তা

বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ড. ইউনূসের নেতৃত্বে চলমান বিতর্ক দিল্লির আস্থায় ধাক্কা দিয়েছে। ভারতের ‘এক দেশ, বহু বিকল্প’ নীতির প্রকাশ ঘটছে এই সিদ্ধান্তে।

এই স্থগিতাদেশ বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিকভাবে অস্বস্তিকর। ভারতের সহায়তায় নির্মীয়মাণ পরিকাঠামো প্রকল্পগুলো কর্মসংস্থান, পণ্য পরিবহণ ও অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আনতে পারতো। মোংলা বন্দরকে খুলনার মাধ্যমে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার ফলে বাংলাদেশ রাজস্ব উপার্জন করতে পারতো, যা এখন অনিশ্চিত।

🔹 চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা

ভারতের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে এখন আঞ্চলিক কৌশল ও কূটনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।