সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান আর নেই
- আপডেট সময় : ০১:১৩:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৩
- / 551
বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান আর নেই। রোববার রাত পৌনে ১১টার দিকে ময়মনসিংহ নগরীর ধোপাখোলা নেক্সাস কার্ডিয়াক হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, তিন মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ময়মনসিংহের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক জানিয়েছেন।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ হাসপাতালে ভিড় জমান। এ সময় এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠানসহ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা হাসপাতালে ছুটে যান। সোমবার সকালে আলমগীর মনসুর (মিন্টু) মেমোরিয়াল কলেজ প্রাঙ্গণে তার কফিনে হাজারো নেতাকর্মী, ভক্ত ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানায়। বিকালে শিববাড়ী দলীয় কার্যালয়ে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানান জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা। আঞ্জুমান ঈদগাহ ময়দানে গার্ড অব অনার শেষে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী ও নানা শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ শরিক হয়। এ সময় ঐতিহাসিক
আঞ্জুমান ঈদগাহ ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আশপাশের রাস্তায়ও মানুষ ভিড় করে। জানাজায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে শত শত নেতাকর্মী অংশ নেন।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ আতিকুর রহমান আতিক, আনোয়ারুল আবেদিন খান তুহিন এমপি, মনিরা সুলতানা মনি এমপি, সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ইকরামুল হক টিটু, বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া, ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজার রহমান, পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মদ ভূঞাঁ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল প্রমুখ।
সাবেক ধর্মমন্ত্রী মতিউর রহমানের মৃত্যুতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক (মন্ত্রী পদমর্যাদা) আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা শোক প্রকাশ করেছেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন শোক প্রকাশ করেছে।
অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের বর্ণাঢ্য জীবন : প্রবীণ সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ১৯৪২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আকুয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবদুর রেজ্জাক এবং মা মেহেরুন্নেসা খাতুন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে এমএসসি করার পর তিনি প্রথমে জামালপুরের নান্দিনা কলেজ এবং পরে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে প্রাণিবিদ্যার শিক্ষক হিসাবে চাকরি করেন। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসাবে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের দুবারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ময়মনসিংহ-৪ আসন থেকে তিনি ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন।
রাজনৈতিক কারণে অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে তিনি ২৩ মাস কারাবরণ করেন। ২০০২ সালে ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে বোমা হামলার মিথ্যা মামলায় তিনি কারাবরণ করেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অকৃত্রিম অবদানের জন্য তিনি ‘মুজিব দর্শন বাস্তবায়ন পরিষদ’ কর্তৃক ২০০০ সালে ‘বঙ্গবন্ধু পদক’ লাভ করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক ও সফল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। রণাঙ্গনে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ হানাদারমুক্ত হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ জানুয়ারি গণ-আন্দোলনে শাহাদতবরণকারী আলমগীর মনসুর মিন্টুর নামে ১৯৬৯ সালে তিনি আলমগীর মনসুর মিন্টু মেমোরিয়াল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৪ বছর তিনি কলেজটির অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এছাড়া তিনি মেহের রাজ্জাক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাসাবাড়ি মার্কেট ও গাঙ্গিনাপাড় হকার্স মার্কেট প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তিনি একাধিক মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজনীতি, শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। The United Cultural Convention, United State of America কর্তৃক ২০০৫ সালে তিনি ‘Peace Prize’ পদকে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি International Biographical Center England কর্তৃক ২০০২ সালে Outstanding Intellectuals of the 21st Century’ পদকে ভূষিত হন।


























