মন্ত্রী-এমপিদের আবদারে চালু হওয়া ট্রেন : এখন খরচ ওঠানোই দায়
- আপডেট সময় : ১১:৪৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ জুলাই ২০২৫
- / 293
বাংলাদেশের রেলওয়ে বর্তমানে বিশাল লোকসানের বোঝা টানছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক চাপ ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমীক্ষা ছাড়াই দলের নেতাদের আবদারে নতুন নতুন ট্রেন চালু, গন্তব্যস্থল সম্প্রসারণ এবং অলাভজনক স্টেশনে ট্রেনের বিরতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রেলওয়ের বার্ষিক লোকসান লাফিয়ে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরে ছিল মাত্র ৬৯০ কোটি টাকা।
বিজয় এক্সপ্রেস: এক সমীক্ষাহীন পরিবর্তনের করুণ পরিণতি
বর্তমানে সবচেয়ে কম যাত্রী নিয়ে চলাচল করা ট্রেনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিজয় এক্সপ্রেস। ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এর যাত্রা শুরু হলেও, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ট্রেনটির যাত্রাপথ পরিবর্তন করে জামালপুরে নেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের ফলে যাত্রার সময় বেড়ে যায় এবং যাত্রী সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, এই পরিবর্তনের আগে কোনো লাভ-লোকসানের সমীক্ষা করা হয়নি। মূলত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দলের নেতাদের আবদারের পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখন এই ট্রেনটি চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে জ্বালানি খরচ, লোকবল ও অন্যান্য ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক চাপের প্রভাব: নতুন ট্রেন ও সম্প্রসারিত গন্তব্য
রেলওয়ে সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনীতিকদের চাপে অসংখ্য নতুন ট্রেন চালু, ট্রেনের গন্তব্যস্থল সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন স্টেশনে ট্রেন থামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির’ কথা বলে নেওয়া হলেও, অধিকাংশই হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে।
যেমন, সাবেক রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন তার নিজ জেলা পঞ্চগড়ে দিনাজপুর ও আশপাশের জেলাগুলোয় চলাচলকারী প্রায় সব আন্তনগর ট্রেনের গন্তব্যস্থল বর্ধিত করেছিলেন। এমনকি মন্ত্রীর ভাইয়ের নামে স্টেশনের নামকরণ এবং নতুন এক জোড়া আন্তনগর ট্রেনও চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে অন্তত পাঁচটি আন্তনগর ট্রেনে পর্যাপ্ত যাত্রী হচ্ছে না, যা রাজনৈতিক চাপে চালু করা হয়েছিল।
অলাভজনক রুটের উদাহরণ:
- সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস: প্রয়াত স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের চাপে ২০১৩ সালে সিরাজগঞ্জ শহরে ট্রেন চালু করা হয়। তবে আশানুরূপ যাত্রী না হওয়ায় ট্রেনটি ঈশ্বরদী ও সিরাজগঞ্জের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ঘোরাঘুরিতে সময় ও অতিরিক্ত জ্বালানি নষ্ট করে। এটি গড়ে ৮৮ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলে এবং মাসে আয় হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
- ঢালারচর এক্সপ্রেস: ঈশ্বরদী থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হয় ২০১৮ সালে, কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই। ২০২০ সালে ট্রেন চালু হলেও, এটি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ‘অপচয়ের’ অন্যতম উদাহরণ। ঢালারচর এক্সপ্রেসের গড় মাসিক আয় প্রায় ৩৬ লাখ টাকা হলেও, বেশিরভাগ যাত্রী স্বল্প দূরত্বের হওয়ায় আয় কম।
- উপকূল এক্সপ্রেস: ঢাকা-নোয়াখালী রুটের এই আন্তনগর ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা গত পাঁচ বছর ধরে কমছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হওয়া, উন্নত বাস চলাচল এবং ট্রেনের সময়সূচি না মানার কারণে এটি এখন আসন পূর্ণ করতে পারছে না। এরপরও ২০২৩ সালের শেষ দিকে এই পথে ‘সুবর্ণচর এক্সপ্রেস’ নামে নতুন এক জোড়া ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যদিও পর্যাপ্ত কোচ ছিল না।
লোকসান এবং সংকট
রেলওয়ে সূত্রমতে, জ্বালানি খরচ, লোকবল ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় শতভাগ যাত্রী পরিবহন করার পরও আন্তনগর ট্রেনে লোকসান হয়। রেলওয়ে এখন প্রতিবছর গড়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনছে, যা ২০০৯-১০ অর্থবছরের তুলনায় (৬৯০ কোটি টাকা) প্রায় চারগুণ। এছাড়া রেলওয়েতে ইঞ্জিন-কোচের তীব্র সংকট রয়েছে, যা নতুন ট্রেন চালু বা রুট সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা।
পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র: যাত্রী বেশি, মনোযোগ কম
রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত রেলের পশ্চিমাঞ্চলে ৩২টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে, যেখানে গড় যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা ১১৪ শতাংশ। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে গড় যাত্রী ৯৪ শতাংশ। পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনগুলোতে যাত্রী চাহিদা বেশি হলেও, বিকল্প রেক (অতিরিক্ত কোচ) না থাকায় বেশিরভাগ ট্রেনই সময়মতো চলতে পারে না, যার ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে।
যেমন, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস গড়ে ১১১ শতাংশ যাত্রী নিয়ে চলে এবং মাসে প্রায় দুই কোটি টাকা আয় করে। একইভাবে লালমনিরহাট এক্সপ্রেসে গড়ে ১১৫ শতাংশ যাত্রী হয় এবং মাসে আয় হয় সোয়া দুই কোটি টাকা। তবে বিকল্প রেক না থাকায় এই ট্রেনগুলো প্রায়শই দেরিতে চলাচল করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলের ‘রুট রেশনালাইজেশন’ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো কম আয় করা ট্রেন বন্ধ করা এবং বেশি যাত্রী চাহিদা রয়েছে এমন পথে ট্রেন বাড়ানো। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রূপম আনোয়ারের নেতৃত্বে একটি কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে, যেখানে বিশেষজ্ঞ ও ছাত্র প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, “লাভজনক রুটে ট্রেন বাড়ানো এবং লোকসানি রুট বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে কাজ চলছে। অতীতে রাজনীতিকদের ইচ্ছাপূরণের ট্রেনগুলো নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অলাভজনক ও অপ্রয়োজনীয় ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হবে।” তিনি স্বীকার করেন, রেলে কোচের সংকট এবং স্থানীয়দের বাধার কারণে এই কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক বলেন, “রেলওয়ে যখন উন্নয়ন প্রকল্প নেয়, তখন দেখানো হয় বিপুল লাভ হবে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা মন্ত্রী হয়ে প্রকাশ্যে বলেন, রেল লাভ করার জন্য চলে না। এগুলো অপেশাদারি কথা।” তিনি আরও বলেন, “কোন পথে কত যাত্রীচাহিদা, লাভ-লোকসান বের করা কঠিন কোনো কাজ নয়। সমীক্ষা ছাড়া নতুন ট্রেন চালু কিংবা নতুন স্টেশনে ট্রেন থামানো উচিত নয়।” তার মতে, রেল এক টাকা আয় করতে আড়াই টাকা ব্যয় করছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
















