ঢাকা ১১:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রাইভেট ক্লিনিকের গোপন ষড়যন্ত্রে : অসুস্থ ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / 556

এক সময়ের ভরসা, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এখন নিজেই অসুস্থ। জনবল সংকট, অচল যন্ত্রপাতি এবং ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার কারণে এই জনপদের হাজারো দরিদ্র রোগী এখন চরম ভোগান্তির শিকার। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের এই করুণ দশা যেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ারই একটি কৌশল।

ভোগান্তির আরেক নাম হাসপাতাল

গলায় প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে যখন হাসিনা বেগম (৩৯) এই হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন থেকেই ভোগান্তি তার পিছু নেয়। টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন, কিন্তু কাউন্টার ফাঁকা। বহু কষ্টে টিকিট কেটে তিনি ইএনটি বিভাগে পৌঁছালেন, কিন্তু তরুণ ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিলেন যা তার রোগ সারাতে পারল না। উপায় না দেখে তিনি ২১০০ টাকা খরচ করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে যান। সেখানেই তার সঠিক রোগ নির্ণয় হয় এবং উপযুক্ত ওষুধে তিনি সুস্থ হন।

হাসিনা বেগমের প্রশ্ন, “জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তারি ফি নেওয়া হয় না বলেই কি রোগীদের প্রতি কোনো দায়বোধ থাকে না?” বস্তুত, এই প্রশ্ন এখন হাজার হাজার ভুক্তভোগী দরিদ্র রোগীর।

জনবল সংকট ও অচল যন্ত্রপাতি

জেলা সদরের এই প্রাচীন হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যার বেশিরভাগই বহির্বিভাগের। কিন্তু রোগীর চাপ বাড়লেও জনবল সংকট চরমে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩৭টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১৬ জন চিকিৎসক। মেডিসিন, ইএনটি, শিশু, সার্জারি, চক্ষুসহ ২১টি বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট নেই বছরের পর বছর।

সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ আলট্রাসনোগ্রাম ও ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। টেকনিশিয়ানের অভাবে ব্যবহার হয় না বলে এ দুটি যন্ত্রই এখন অকেজো। এমনকি ব্লাড ব্যাংক অফিসার না থাকায় একজন ব্রাদারের তত্ত্বাবধানে চলছে ব্লাড ব্যাংক ও প্যাথলজি বিভাগ। প্যাথলজির অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেস্টও হয় না।

ভয়াবহ পরিবেশ ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা

হাসপাতালের পরিবেশের অবস্থাও ভয়াবহ। ২ কোটি টাকা বকেয়া থাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা ও মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ করেন না। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরে আবর্জনার স্তূপে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গুরুতর রোগী ভর্তি করা হয় না বলে সার্জারি ওয়ার্ডটি প্রায় খালিই পড়ে থাকে।

প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই এই দশা?

প্রায় একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালটিকে অকেজো করে রাখা হয়েছে বলে শহরবাসীর অভিমত। তাদের অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে সুবিধা দিতেই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান উন্নয়ন করা হয় না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: গণেশ কুমার আগারওয়ালা সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, টেকনিশিয়ানের অভাবে অনেক পরীক্ষা বন্ধ। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় চুরি ঠেকানো যায় না।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ছিদ্দীকুর রহমান জানান, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্টসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অস্ত্রোপচারেও সমস্যা হচ্ছে। তিনি প্রতি মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠিয়েও কোনো সুফল পাননি। হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের উন্নয়নের চেষ্টা করেও নানা সমস্যার কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

প্রাইভেট ক্লিনিকের গোপন ষড়যন্ত্রে : অসুস্থ ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল

আপডেট সময় : ০৯:৪৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

এক সময়ের ভরসা, ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল এখন নিজেই অসুস্থ। জনবল সংকট, অচল যন্ত্রপাতি এবং ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার কারণে এই জনপদের হাজারো দরিদ্র রোগী এখন চরম ভোগান্তির শিকার। রোগীদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের এই করুণ দশা যেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ারই একটি কৌশল।

ভোগান্তির আরেক নাম হাসপাতাল

গলায় প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে যখন হাসিনা বেগম (৩৯) এই হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন থেকেই ভোগান্তি তার পিছু নেয়। টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন, কিন্তু কাউন্টার ফাঁকা। বহু কষ্টে টিকিট কেটে তিনি ইএনটি বিভাগে পৌঁছালেন, কিন্তু তরুণ ডাক্তার কিছু ওষুধ লিখে দিলেন যা তার রোগ সারাতে পারল না। উপায় না দেখে তিনি ২১০০ টাকা খরচ করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রাইভেট চেম্বারে যান। সেখানেই তার সঠিক রোগ নির্ণয় হয় এবং উপযুক্ত ওষুধে তিনি সুস্থ হন।

হাসিনা বেগমের প্রশ্ন, “জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তারি ফি নেওয়া হয় না বলেই কি রোগীদের প্রতি কোনো দায়বোধ থাকে না?” বস্তুত, এই প্রশ্ন এখন হাজার হাজার ভুক্তভোগী দরিদ্র রোগীর।

জনবল সংকট ও অচল যন্ত্রপাতি

জেলা সদরের এই প্রাচীন হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আট শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, যার বেশিরভাগই বহির্বিভাগের। কিন্তু রোগীর চাপ বাড়লেও জনবল সংকট চরমে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৩৭টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১৬ জন চিকিৎসক। মেডিসিন, ইএনটি, শিশু, সার্জারি, চক্ষুসহ ২১টি বিভাগে কোনো বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট নেই বছরের পর বছর।

সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ আলট্রাসনোগ্রাম ও ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। টেকনিশিয়ানের অভাবে ব্যবহার হয় না বলে এ দুটি যন্ত্রই এখন অকেজো। এমনকি ব্লাড ব্যাংক অফিসার না থাকায় একজন ব্রাদারের তত্ত্বাবধানে চলছে ব্লাড ব্যাংক ও প্যাথলজি বিভাগ। প্যাথলজির অনেক গুরুত্বপূর্ণ টেস্টও হয় না।

ভয়াবহ পরিবেশ ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা

হাসপাতালের পরিবেশের অবস্থাও ভয়াবহ। ২ কোটি টাকা বকেয়া থাকায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা-আবর্জনা ও মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ করেন না। ফলে হাসপাতালের অভ্যন্তরে আবর্জনার স্তূপে হাঁটাচলা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গুরুতর রোগী ভর্তি করা হয় না বলে সার্জারি ওয়ার্ডটি প্রায় খালিই পড়ে থাকে।

প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই এই দশা?

প্রায় একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল এক সময় এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাসপাতালটিকে অকেজো করে রাখা হয়েছে বলে শহরবাসীর অভিমত। তাদের অভিযোগ, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে সুবিধা দিতেই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির সেবার মান উন্নয়ন করা হয় না।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: গণেশ কুমার আগারওয়ালা সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, টেকনিশিয়ানের অভাবে অনেক পরীক্ষা বন্ধ। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় চুরি ঠেকানো যায় না।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ছিদ্দীকুর রহমান জানান, রেডিওলজিস্ট, প্যাথলজিস্টসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অস্ত্রোপচারেও সমস্যা হচ্ছে। তিনি প্রতি মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাহিদাপত্র পাঠিয়েও কোনো সুফল পাননি। হাসপাতালের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের উন্নয়নের চেষ্টা করেও নানা সমস্যার কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে বলেও তিনি জানান।