ঢাকা ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণহত্যার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৩:৫১:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫
  • / 221

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় ছয়জনকে হত্যার দায়ে তাঁকে এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) বেলা ২টা ৫০ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ

আদালতের রায়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

সাজার ধরন: প্রমাণিত তিনটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর একটি অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ: রায়ে আদালত শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের মাস্টারমাইন্ড (পরিকল্পনাকারী), হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার বা সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সহ-আসামি ও রাজসাক্ষীর ভূমিকা

এই মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি দুই আসামি হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

পলাতক: আসাদুজ্জামান কামালও শেখ হাসিনার মতো পলাতক।

রাজসাক্ষী: সাবেক আইজিপি আল মামুন এই মামলার একমাত্র গ্রেফতার আসামি। তিনি মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগসমূহ

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনর্গঠন করা হয়। এই পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয়।

বিচার শুরু: গত ১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের সময়কাল ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত।

পাঁচটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। ২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ দেওয়া। ৩. রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যার ঘটনায় প্ররোচনা, উসকানি, ষড়যন্ত্র ও সহায়তা। ৪. গত ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ। ৫. আশুলিয়ায় জীবিত একজনকেসহ মোট ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।

সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং প্রতিক্রিয়া

মামলায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, আহত ব্যক্তি, প্রতক্ষ্যদর্শী এবং চিকিৎসকদের সহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জব্দ করা গুলি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

যুক্তি-তর্ক: গত ১২ অক্টোবর এ মামলার যুক্তি-তর্ক শুরু হয় এবং ২৩ অক্টোবর শেষ হয়। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার সময় জনাকীর্ণ আদালতে জুলাই-অগাস্টে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উল্লাস প্রকাশ করেন এবং স্লোগান দেন।

নিরাপত্তা: রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবি-র পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়।

জুলাই গণহত্যার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড

আপডেট সময় : ০৩:৫১:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)। রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় ছয়জনকে হত্যার দায়ে তাঁকে এই সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে।

আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) বেলা ২টা ৫০ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ

আদালতের রায়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

সাজার ধরন: প্রমাণিত তিনটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর একটি অপরাধে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ: রায়ে আদালত শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী সব ধরনের অপরাধের মাস্টারমাইন্ড (পরিকল্পনাকারী), হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার বা সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সহ-আসামি ও রাজসাক্ষীর ভূমিকা

এই মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া বাকি দুই আসামি হলেন— সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

পলাতক: আসাদুজ্জামান কামালও শেখ হাসিনার মতো পলাতক।

রাজসাক্ষী: সাবেক আইজিপি আল মামুন এই মামলার একমাত্র গ্রেফতার আসামি। তিনি মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করে অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অভিযোগসমূহ

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুনর্গঠন করা হয়। এই পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি দায়ের করা হয়।

বিচার শুরু: গত ১০ জুলাই তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের সময়কাল ছিল ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত।

পাঁচটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। ২. হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করে নির্মূলের নির্দেশ’ দেওয়া। ৩. রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাইদ হত্যার ঘটনায় প্ররোচনা, উসকানি, ষড়যন্ত্র ও সহায়তা। ৪. গত ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা ছয়জনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ। ৫. আশুলিয়ায় জীবিত একজনকেসহ মোট ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ।

সাক্ষ্য, প্রমাণ এবং প্রতিক্রিয়া

মামলায় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী, আহত ব্যক্তি, প্রতক্ষ্যদর্শী এবং চিকিৎসকদের সহ মোট ৫৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও, ভিডিও, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং জব্দ করা গুলি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

যুক্তি-তর্ক: গত ১২ অক্টোবর এ মামলার যুক্তি-তর্ক শুরু হয় এবং ২৩ অক্টোবর শেষ হয়। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড দাবি করেন।

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার সময় জনাকীর্ণ আদালতে জুলাই-অগাস্টে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উল্লাস প্রকাশ করেন এবং স্লোগান দেন।

নিরাপত্তা: রায়কে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবি-র পাশাপাশি সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়।