চার কন্যাসন্তানের জননী বিধবা সুরাইয়া বেগম (৬০) এর বসতভিটা জবরদখল করে উচ্ছেদ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে আপন দেবর ও ভাতিজার বিরুদ্ধে। কন্যাদের উপর মারপিট করে শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতনের মতো গর্হিত কাজ করেছে চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নের আশাপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিয়া বাড়ির ঘটনা এটি। এ বিষয়ে মধুখালী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও এখনও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও নির্যাতন:
জানা যায়, সুরাইয়া বেগমের স্বামী হামিদুল রহমান মিয়া ২০০৭ সালে মারা যান। হামিদুল রহমান মারা যাওয়ার পর তাদের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় সুরাইয়া বেগমের কাছে আফসোস সম্পত্তি দাবি করে ভিটে ছাড়া করার চেষ্টা করেন মৃত হামিদুল রহমানের ছোট ভাই শহিদুর রহমান মিয়া ও আরেক ভাই ফজলুর রহমান মিয়ার ছেলে তাওয়াবুর রহমান বাবু। এ ঘটনার পর সুরাইয়া বেগম তার শ্বশুর মৃত আব্দুল জলিল মিয়ার জমি-সম্পত্তি বাটোয়ারার আবেদন করেন এবং তার দেবর ও ভাতিজাদেরকে জমি জমা ভাগ বাটোয়ারা করে দিতে বলেন। এরপর থেকেই শুরু হয় সুরাইয়া বেগম ও তার চার কন্যার উপর নানাভাবে নির্যাতন। এমনকি তাদের লাগানো ফসলি জমি থেকেও ফসল তুলতে দেন না তার শরিকেরা। সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সুরাইয়া বেগম ও তার কন্যাদের বিবস্ত্র করে নির্যাতন করেন তাদের চাচাতো ভাই বাবু মিয়া ও তপুমিয়া। তৎক্ষণাৎ নির্যাতনের শিকার সুরাইয়া বেগমের ছোট কন্যা সাজিয়া আফরিন মধুখালী থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও তাওয়াবুর রহমান বাবু বিএনপি নেতা হওয়ায় পুলিশ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য ও আইনি জটিলতা:
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, আশাপুর গ্রামের মিয়া বাড়ির মৃত আব্দুল জলিল মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে হাবিবুর রহমান মিয়ার কোনো পুত্র সন্তান নেই। ২০০৭ সালে হামিদুল রহমান মিয়া মারা গেলে মুসলিম আইন অনুযায়ী এখন তার জীবিত এক চাচা ও অন্যান্য চাচাতো ভাইয়েরা। কিন্তু এই আফসোস সম্পত্তির দাবির ছলে চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা বিধবা সুরাইয়া বেগম ও তার কন্যাদের উপর হামলা চালিয়ে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ চেষ্টা করে। বিধবা সুরাইয়া বেগম বলেন, “আমার চার কন্যা সন্তানের মধ্যে তিন কন্যার বিবাহ হয়ে গেছে। আমি এক কন্যা নিয়ে আমার স্বামীর ভিটায় বসবাস করি। আমার স্বামীর অন্যান্য ভাইয়েরাও পাশাপাশি আলাদা বাড়ি করে বসবাস করে। তাদের সকলের জমি বাটোয়ারা করা। আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর এখন আমাদের ভিটার জমিতে আফছা জমির দাবি করে নির্যাতন চালানো শুরু করে। তারা পাশেই থাকে, আমার ঘরে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। সারাক্ষণ নিরাপত্তা হীনতায় ভুগি। গত ২৫ তারিখে আমার ছোট কন্যার জামাকাপড় ছিঁড়ে মারপিট করে। আমার ভাতিজা তাওয়াবুর রহমান বাবু বিএনপি নেতা হওয়ায় পুলিশও কিছু বলে না।” সুরাইয়া বেগমের সেজ কন্যা নুপুর সুলতানা বলেন, “মা আর বোন একা বাড়িতে থাকে। কখন কি হয় এ দুশ্চিন্তায় থাকি। কয়েকদিন আগে তারা একবার আক্রমণ করে। এজন্য আমি বাড়িতে এসেছি। বাড়ি এসে স্থানীয় গণ্যমান্যদের সাথে কথা বলেছি, কেউ কোনো কথা বলেন না আমাদের হয়ে। স্থানীয় মেম্বারের সহায়তায় জমির বাটোয়ারা মামলা করতে কাজ শুরু করেছি। মেম্বারের মাধ্যমে ওয়ারিশ সনদের ব্যবস্থা করেছি। সেখানেও তারা বিপত্তি বাধিয়েছে। আমার তৈরি ওয়ারিশ সনদকে ভুল প্রমাণ করাতে তারা জন্ম তারিখ বাড়িয়ে জন্ম সনদ তৈরি করে আমার কাজে ক্ষতি করছে। স্থানীয় মেম্বার নজরুল ইসলাম আমাদের পাশে দাঁড়ালে তাকেও নানাভাবে হয়রানি করছে। আমরা আমার বাবার পৈতৃক সম্পত্তি থেকে মুসলিম আইন অনুযায়ী আফসোস সম্পত্তি প্রদান করতে চাই। এজন্য বাটোয়া মামলা করে আইনগতভাবে সমাধান করতে চাই। কিন্তু আমার বাবার সম্পত্তি জোর করে জবরদখল হতে দেবো না।” মিয়া বাড়ির মুরব্বি ও সন্তান লুৎফর রহমান মিয়া বলেন, “সুরাইয়া ও তার কন্যাদের উপর অন্যায়ভাবে নির্যাতন করছে তারা। তারা আমার কথা শোনেন না। আমি একাধিকবার বলেছি। বাবু এখন বিএনপি নেতা হওয়ায় সে কাউকে গোণে না।” গাজনা ইউনিয়নের স্থানীয় মেম্বার নজরুল ইসলাম বলেন, “এলাকার কেউ অসহায় বিধবা পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়াতে সাহস পান না বিএনপি নেতা তাওয়াবুর রহমান বাবুর ভয়ে। আমি তাদের বাটোয়ারা মামলা করার বিষয়টি সমাধানের জন্য এগিয়ে যাই। মামলার প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহায়তা করি। তাদের দেওয়া তথ্যমতে পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ বের করে দেই। এতে বাবু ক্ষিপ্ত হয় আমার উপর। আমার বিরুদ্ধে বাবু মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।” গাজনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো: গোলাম কিবরিয়া বলেন, “মৃত হামিদুল রহমানের পরিবারটি একটি অসহায় পরিবার। হামিদের ভাই ভাতিজারা তাদের সাথে ভালো আচরণ করছেন না। আমি একাধিকবার তাদের বলেছি। তাদের নিয়ে সালিশও করেছি। কিন্তু দুপক্ষই কেউ কারো কথা শোনেন না।” মৃত হামিদুল রহমানের ভাই শহিদুর রহমান মিয়া বলেন, “আমরা আমাদের জমির বাটোয়ারা করানোর জন্য প্রায় ১০ বারের বেশি বসেছি। কেউই কথা শুনতে চায় না। আমার ভাই মৃত হামিদুল রহমানের পরিবার বাটোয়ারা মূলে ৩ একরের বেশি সম্পত্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু তারা ভোগ দখলে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি ব্যবহার করছে। তারা ছাড়তে চায় না। আর তারা অসহায় নয় তারা সবাই স্বাবলম্বী। আমাদের পৈতৃক ভিটায় তাদের জন্য পা রাখতে পারি না। পৈতৃক ভিটায় তো আমাদের ভাগ আছে স্মৃতি আছে। তার মেয়েরা সেখানে গেলে বলে আমাদের কুপায় দেবে। একথা শুনে আমার মানবতা থাকে না।” এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী সার্কেল) মো: ইমরুল হাসান বলেন, “জমি সংক্রান্ত বিরোধ বিষয়টি আসলে বিজ্ঞ আদালতের বিষয়, এ বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত আদালতের। তবে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা খেয়াল রাখবো।”
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:
এ ঘটনায় এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।