রোহিঙ্গা ক্যাম্প
পাহাড় ধসে মাটির নিচে মাদ্রাসা, নিহত বেড়ে ৮
- আপডেট সময় : ০৭:৪৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
- / 116
প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর কত প্রাণ কেড়ে নিলে শান্ত হবে এই পাহাড়? এবার উখিয়ার শরণার্থী শিবিরের এক চিলতে আশ্রয়ে নামল যমদূতের মতো কালো অন্ধকার। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার ৫নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে ঘটে গেল এক হাড়হিম করা বিপর্যয়। টানা ভারী বর্ষণে হঠাৎ বিকট শব্দে ধসে পড়ল পাহাড়ের এক বিশাল অংশ। আর চোখের পলকে, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল একটি মাদ্রাসা ও হিফজ কেন্দ্র। যেখানে বসে তখন পরম মনে পবিত্র কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল অর্ধশতাধিক নিষ্পাপ শিশু।
এই ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৭ জন শিশুশিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষকসহ মোট ৮ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ২৭ জনকে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা—কাদার নিচে এখনও চাপা পড়ে আছেন অনেকে, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কয়েক সেকেন্ডের প্রলয় ও বাতাসের বুকে কান্নার রোল
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরের দিকে যখন চারপাশ অন্ধকার করে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল, ঠিক তখনই যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো এক বিকট শব্দ শোনা যায়। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের এক বিশাল মাটির চাঁই হুড়মুড় করে এসে পড়ে ওই মাদ্রাসার ওপর। ভেতরে আটকে পড়া শিশুদের বুকফাঙা আর্তনাদ আর চিৎকারে পুরো ক্যাম্পে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিপর্যয়ের খবর পাওয়া মাত্রই প্রথমে স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা খালি হাতেই কাদা ও মাটি সরানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান জোরদার করেন।
উদ্ধারকাজের টানটান উত্তেজনা ও মৃত্যুর খতিয়ান
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন—
“রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৭ জনই অবুঝ শিশুশিক্ষার্থী এবং একজন তাদের শিক্ষক। উদ্ধার অভিযান এখনও চলছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আহত অন্তত ২৭ জনকে উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
পাহাড়ের কান্না ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির স্থায়ী আতঙ্ক
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে টানা বৃষ্টির কারণে নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় উখিয়া ও টেকনাফের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এই ঘটনা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে তৈরি করা এই অপরিকল্পিত ও ঠাসাঠাসি শরণার্থী শিবিরের অন্তর্নিহিত বিপন্নতাকেই আবারও নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। প্লাস্টিক আর বাঁশের চালের নিচে মাথা গোঁজা এই ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষদের জন্য প্রতি বর্ষাই যেন মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আসে। আজ যে ৭টি শিশু কোরআনের আয়াত মুখে নিয়ে মাটির নিচে চিরতরে হারিয়ে গেল, তাদের এই অকালপ্রস্থান আমাদের মানবতাকে আরও একবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।


















