ঢাকা ০৬:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিসেম্বরে ফিরছেন শেখ হাসিনা: দেশজুড়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও হুমকির মাস্টারমাইন্ড কারা?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৫:৪৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 80

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে টার্গেট করে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তৎপরতা, ককটেল বিস্ফোরণ, ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি এবং সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় থমথমে পুরো দেশ। সাধারণ মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির এই গভীর ষড়যন্ত্রের জাল আসলে কোথায় বোনা হচ্ছে?

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আকস্মিক নানা অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। জনমনে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে কোথাও গুলি ছোড়া, কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ, আবার কোথাও বা ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি কুচক্রী মহল।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল মাঠের সহিংসতাই নয়; বরং ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা ভার্চুয়াল নম্বর এবং ভিপিএন ব্যবহার করে অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার এক ভয়ংকর প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংগীতশিল্পীর গাড়িতে গুলি ও কুরিয়ারে ভাঙচুর

সাম্প্রতিক এই আতঙ্কের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে সংস্কৃতি ও ব্যবসা অঙ্গনেও। গত শনিবার (২৫ অক্টোবর) ভোরের দিকে রাজধানীর মগবাজার এলাকার বিশাল সেন্টারের সামনে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। চালকের পেছনের আসন লক্ষ্য করে চালানো এই গুলিতে কাচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘটনার সময় গাড়িতে আসিফ বা তাঁর চালক না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পান তিনি। তবে ভোরের এই আকস্মিক হামলায় পুরো শোবিজ অঙ্গনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে গত ২০ অক্টোবর পুরান ঢাকার হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজে হানা দেয় ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি সশস্ত্র দল। মুখে মাস্ক ও হেলমেট পরিহিত ওই সন্ত্রাসীরা সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং প্রায় ৩১ লাখ টাকার মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর মামলার বাদী কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিনকে শনিবার রাতে ফোন করে চরম ভাষায় হুমকি দেওয়া হয়—”আজ শনিবারের মধ্যে মামলা তুলে না নিলে তোর লাশ পড়ে থাকবে!” হুমকিদাতা নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের লোক হিসেবে পরিচয় দেয়।

ভার্চুয়াল ত্রাস ও অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের কারসাজি

গোয়েন্দা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ডার্ক ওয়েবসাইট থেকে অবৈধ ভার্চুয়াল ফোন নম্বর কিনে এবং ভিপিএন ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হুমকি দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তদন্তকারী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গণমাধ্যমকর্মীদের সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করতে এবং পুলিশ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দিতেই এই ভার্চুয়াল আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

খুলনা অঞ্চলে খুনের হোলিখেলা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সুপরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে খুলনা শহরকে হঠাৎ করেই সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করা হয়েছে। গত কয়েকদিনে সেখানে একের পর এক খুন, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ অক্টোবর মাত্র চৌদ্দ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনায় পৃথক দুটি স্থানে দুজনকে হত্যা করা হয়। এছাড়া শনিবার তেরখাদা উপজেলায় এক যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি

পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং পুলিশ-প্রশাসনের মনোবল ভাঙতে চাইছে। তবে তাদের এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হবে না। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে গুজব ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে ডিএমপি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দুইমুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

ডিসেম্বরে ফিরছেন শেখ হাসিনা: দেশজুড়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও হুমকির মাস্টারমাইন্ড কারা?

আপডেট সময় : ০৫:৪৬:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে টার্গেট করে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহরগুলোয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের তৎপরতা, ককটেল বিস্ফোরণ, ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি এবং সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে আকস্মিক গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় থমথমে পুরো দেশ। সাধারণ মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির এই গভীর ষড়যন্ত্রের জাল আসলে কোথায় বোনা হচ্ছে?

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আকস্মিক নানা অপতৎপরতা শুরু হয়েছে। জনমনে ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করতে কোথাও গুলি ছোড়া, কোথাও ককটেল বিস্ফোরণ, আবার কোথাও বা ঝটিকা মিছিল বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি কুচক্রী মহল।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল মাঠের সহিংসতাই নয়; বরং ডার্ক ওয়েব থেকে কেনা ভার্চুয়াল নম্বর এবং ভিপিএন ব্যবহার করে অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে দেশের শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার ও বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার এক ভয়ংকর প্রবণতাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংগীতশিল্পীর গাড়িতে গুলি ও কুরিয়ারে ভাঙচুর

সাম্প্রতিক এই আতঙ্কের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে সংস্কৃতি ও ব্যবসা অঙ্গনেও। গত শনিবার (২৫ অক্টোবর) ভোরের দিকে রাজধানীর মগবাজার এলাকার বিশাল সেন্টারের সামনে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। চালকের পেছনের আসন লক্ষ্য করে চালানো এই গুলিতে কাচ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ঘটনার সময় গাড়িতে আসিফ বা তাঁর চালক না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পান তিনি। তবে ভোরের এই আকস্মিক হামলায় পুরো শোবিজ অঙ্গনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে গত ২০ অক্টোবর পুরান ঢাকার হাজারীবাগে এজেআর কুরিয়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজে হানা দেয় ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি সশস্ত্র দল। মুখে মাস্ক ও হেলমেট পরিহিত ওই সন্ত্রাসীরা সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় এবং প্রায় ৩১ লাখ টাকার মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর মামলার বাদী কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিনকে শনিবার রাতে ফোন করে চরম ভাষায় হুমকি দেওয়া হয়—”আজ শনিবারের মধ্যে মামলা তুলে না নিলে তোর লাশ পড়ে থাকবে!” হুমকিদাতা নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের লোক হিসেবে পরিচয় দেয়।

ভার্চুয়াল ত্রাস ও অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের কারসাজি

গোয়েন্দা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ডার্ক ওয়েবসাইট থেকে অবৈধ ভার্চুয়াল ফোন নম্বর কিনে এবং ভিপিএন ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো অ্যানক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হুমকি দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তদন্তকারী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও গণমাধ্যমকর্মীদের সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। মামলার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করতে এবং পুলিশ প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দিতেই এই ভার্চুয়াল আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

খুলনা অঞ্চলে খুনের হোলিখেলা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সুপরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অংশ হিসেবে খুলনা শহরকে হঠাৎ করেই সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করা হয়েছে। গত কয়েকদিনে সেখানে একের পর এক খুন, গুলিবর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। গত ২২ অক্টোবর মাত্র চৌদ্দ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনায় পৃথক দুটি স্থানে দুজনকে হত্যা করা হয়। এছাড়া শনিবার তেরখাদা উপজেলায় এক যুবদল নেতাকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে।

প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারি

পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, একটি কুচক্রী মহল ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং পুলিশ-প্রশাসনের মনোবল ভাঙতে চাইছে। তবে তাদের এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হবে না। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে গুজব ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো অপচেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করতে ডিএমপি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দুইমুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।