ঢাকা ০২:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরের রাজনীতিতে নতুন মোড়: বিএনপি-জামায়াতের একক দাপট, নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫
  • / 618

ফরিদপুর, ২২ জুলাই ২০২৫ (মঙ্গলবার) – পদ্মা, মধুমতি ও আড়িয়াল খাঁ নদীবেষ্টিত ফরিদপুরের রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দলটির প্রভাবশালী নেতারা পলাতক এবং কর্মীরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ায়, এই মাঠে এখন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সরব উপস্থিতি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এই দুই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফরিদপুরের ৪টি আসন ও প্রাক-নির্বাচনী তৎপরতা

ফরিদপুর জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে চারটি সংসদীয় আসন। নির্বাচনের আমেজ তৈরি হওয়ায় বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের কয়েকজন নেতাও প্রচার চালাচ্ছেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা বা আলোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

ফরিদপুর-১ (মধুখালী, আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী)

এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের মধ্যে। পূর্বে দুবার বিএনপি জয়ী হলেও, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমে যায়। এবার ভোটের পরিবেশ ফিরলেও, জাতীয়তাবাদী তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির টিকিটের জন্য মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম এবং বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দীন মিয়া ঝুনু। তাদের নেতৃত্বে দুটি বলয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিরোধ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে একাধিকবার হামলা-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের দিকভ্রান্ত করছে। এছাড়াও, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিএনপি নেতা শাহাবুদ্দিন আহমেদও মনোনয়ন চাইছেন। বর্ষীয়ান নেতা শাহ মো. আবু জাফরও ধানের শীষ পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী ড. ইলিয়াস মোল্লাকে আগেই মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি পুরোদমে প্রচারে নেমেছেন। বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে জামায়াতের ঢাকা জেলা শাখার এই কর্ম পরিষদ ও শুরা সদস্য ইতোমধ্যে মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি ভোটারদের বুঝাতে চেষ্টা করছেন যে, “আল্লাহর সৃষ্ট মহাবিশ্বে তার বিধান কার্যকর থাকায় কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। এই বিধান মানুষের উপর কার্যকর করলে মানবজাতির মধ্যে যে অশান্তি, অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা সহজে দূরীভূত হতে পারে।” অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ তাকেই নির্বাচিত করবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস।

খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি শরাফাত হোসাইনও নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। তিনি নিয়মিত গণসংযোগ, ওলামা সম্মেলন, ধর্মীয় আলোচনা সভা ও দুস্থদের মাঝে সহায়তা বিতরণের মতো কর্মসূচি পালন করছেন।

ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা)

ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এই আসন থেকে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এবং বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর বিভাগ) শামা ওবায়েদ নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন। পরবর্তীতে শহিদুল ইসলাম বাবুল ফরিদপুর-৪ আসনে প্রচার শুরু করায়, এখন পর্যন্ত শামা ওবায়েদের একমাত্র সরব প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আর কাউকে দেখা যায়নি।

শামা ওবায়েদ ‘আমার দেশ’কে বলেন, “আমার বাবার স্মৃতি বিজড়িত এ আসনে আওয়ামী আমলে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমি নির্বাচিত হয়ে দলীয় নির্দেশিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব। একই সঙ্গে আমি নারীদের জন্য কাজ করতে চাই। এ ব্যাপারে আমার বিশেষ পদক্ষেপ থাকবে।”

জামায়াত এখানে মাওলানা সোহরাব হোসেনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে মাওলানা শাহ মো. জামাল হোসেন, খেলাফত মজলিস থেকে আল্লামা শাহ আকরাম আলী, খেলাফত আন্দোলন থেকে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বকুল এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে ফারুক ফকির প্রচার চালাচ্ছেন।

ফরিদপুর-৩ (সদর)

এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন:

জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোশাররফ আলীর ছেলে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা।

বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ তনয়া, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

অ্যাডভোকেট ইছা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আশির দশকে তিনি জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং দীর্ঘ ৪৬ বছরে চারবার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানেও তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ সালে ‘স্বৈরাচার হাসিনার আমলে’ রাজপথে গুলিবিদ্ধ হন এবং ‘আওয়ামী শাসনের সময়’ বহুবার আহত ও কারা নির্যাতিত হয়েছেন। তিনি বলেন, পূর্বে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের প্রতি শ্রদ্ধাবশত দলীয় মনোনয়ন চাননি, তবে বর্তমানে নেতাকর্মীরা তাকেই যোগ্য মনে করছেন এবং তিনি আশা করেন দলও তার ওপর আস্থা রাখবে।

নায়াব ইউসুফ বলেন, “আমরা অসহায় মানুষের জীবন মানের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করি। মানুষ প্রয়োজনে আমাকে পাশে পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য আমার কাজ করার ইচ্ছা আছে। তাই আগামী নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ‘গ্রিন সিগনাল’ দিয়েছেন। আসনটি বিএনপিকে উপহার দিতে পারব বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।”

এছাড়াও কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি মাহাবুবুল হোসেন পিংকু বিএনপির টিকিট প্রত্যাশা করলেও নির্বাচনের মাঠে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।

জামায়াত থেকে নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলটির কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক আবদুত তওয়াব। তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

ফরিদপুর-৪(সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন)

এই আসনটিতে বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব শূন্যতা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা এবং নেতৃত্বে দুর্বলতার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খান বাবুল বিএনপির পক্ষে নির্বাচনি প্রচার শুরু করলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি ভোটের মাঠ তৈরির পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া বিএনপিকে চাঙ্গা করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন।

আসনটি থেকে বিএনপির আরেকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া। তিনি ভোটারদের আস্থা বাড়াতে নিয়মিত সভা-সমাবেশ, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।

শাহজাদা মিয়া বলেন, “শ্রদ্ধেয় কেএম ওবায়দুর রহমান ও চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের পর আমিই ফরিদপুরের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা। দীর্ঘ ২২ বছর জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমার স্ত্রী ইয়াসমীন আরা হক দুই বারের সংসদ সদস্য। এবার দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে শতভাগ আশাবাদী।”

সদরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কাজী বদরুজ্জামান বদু ‘আমার দেশ’কে জানান, দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই তারা কাজ করবেন।

জামায়াত প্রার্থী সরোয়ার হোসেনের উল্লেখযোগ্য কোনো গণসংযোগ লক্ষ্য করা যায়নি। তার নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এখানে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মিজানুর রহমান গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করলেও সাধারণ ভোটারদের মতে তিনি ভোটের হিসাবে পিছিয়ে আছেন। এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থপতি মুজাহিদ বেগ পোস্টার সাঁটিয়ে এলাকায় নিজের জানান দিচ্ছেন।

ভোটার ফয়সাল সরদার বলেন, “আমরা আগামী নির্বাচনে দুর্নীতিবাজ, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারকারী, চাঁদাবাজ ও স্বার্থান্বেষী কাউকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতা আশা করি। অন্যথায় জুলাই বিপ্লবের হাজারো প্রাণ বিসর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।”

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) ফরিদপুর জেলা শাখার সাবেক সভাপতি এবং ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, “১৯৭০ সাল থেকে নির্বাচনগুলো দেখছি। আগের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর। কিন্তু গত তিনটি নির্বাচনে সে উৎসব হারিয়ে যায়। আগামীতে একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের আশা করছি। মাঝে মাঝে ভয় হয় যে এই নির্বাচনটিও কোনো বিশেষ দল ছিনিয়ে নেবে কিনা। কিন্তু তারপরও আমি আশাবাদী যে আগামীতে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”

ফরিদপুরের রাজনীতিতে নতুন মোড়: বিএনপি-জামায়াতের একক দাপট, নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি

আপডেট সময় : ০১:৩৪:৪৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫

ফরিদপুর, ২২ জুলাই ২০২৫ (মঙ্গলবার) – পদ্মা, মধুমতি ও আড়িয়াল খাঁ নদীবেষ্টিত ফরিদপুরের রাজনীতিতে গত কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। দলটির প্রভাবশালী নেতারা পলাতক এবং কর্মীরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ায়, এই মাঠে এখন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সরব উপস্থিতি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এই দুই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফরিদপুরের ৪টি আসন ও প্রাক-নির্বাচনী তৎপরতা

ফরিদপুর জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে চারটি সংসদীয় আসন। নির্বাচনের আমেজ তৈরি হওয়ায় বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের কয়েকজন নেতাও প্রচার চালাচ্ছেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থীদের কোনো তৎপরতা বা আলোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

ফরিদপুর-১ (মধুখালী, আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী)

এই আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও খেলাফত মজলিসের মধ্যে। পূর্বে দুবার বিএনপি জয়ী হলেও, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব কমে যায়। এবার ভোটের পরিবেশ ফিরলেও, জাতীয়তাবাদী তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিএনপির টিকিটের জন্য মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সভাপতি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম এবং বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শামসুদ্দীন মিয়া ঝুনু। তাদের নেতৃত্বে দুটি বলয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিরোধ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে একাধিকবার হামলা-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা তৃণমূল নেতাকর্মীদের দিকভ্রান্ত করছে। এছাড়াও, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির এবং অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিএনপি নেতা শাহাবুদ্দিন আহমেদও মনোনয়ন চাইছেন। বর্ষীয়ান নেতা শাহ মো. আবু জাফরও ধানের শীষ পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী ড. ইলিয়াস মোল্লাকে আগেই মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি পুরোদমে প্রচারে নেমেছেন। বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগে জামায়াতের ঢাকা জেলা শাখার এই কর্ম পরিষদ ও শুরা সদস্য ইতোমধ্যে মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি ভোটারদের বুঝাতে চেষ্টা করছেন যে, “আল্লাহর সৃষ্ট মহাবিশ্বে তার বিধান কার্যকর থাকায় কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। এই বিধান মানুষের উপর কার্যকর করলে মানবজাতির মধ্যে যে অশান্তি, অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা সহজে দূরীভূত হতে পারে।” অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণ তাকেই নির্বাচিত করবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস।

খেলাফত মজলিস থেকে মুফতি শরাফাত হোসাইনও নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছেন। তিনি নিয়মিত গণসংযোগ, ওলামা সম্মেলন, ধর্মীয় আলোচনা সভা ও দুস্থদের মাঝে সহায়তা বিতরণের মতো কর্মসূচি পালন করছেন।

ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা)

ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর এই আসন থেকে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল এবং বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর বিভাগ) শামা ওবায়েদ নির্বাচনি প্রচার শুরু করেন। পরবর্তীতে শহিদুল ইসলাম বাবুল ফরিদপুর-৪ আসনে প্রচার শুরু করায়, এখন পর্যন্ত শামা ওবায়েদের একমাত্র সরব প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আর কাউকে দেখা যায়নি।

শামা ওবায়েদ ‘আমার দেশ’কে বলেন, “আমার বাবার স্মৃতি বিজড়িত এ আসনে আওয়ামী আমলে কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমি নির্বাচিত হয়ে দলীয় নির্দেশিত ৩১ দফা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকব। একই সঙ্গে আমি নারীদের জন্য কাজ করতে চাই। এ ব্যাপারে আমার বিশেষ পদক্ষেপ থাকবে।”

জামায়াত এখানে মাওলানা সোহরাব হোসেনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন থেকে মাওলানা শাহ মো. জামাল হোসেন, খেলাফত মজলিস থেকে আল্লামা শাহ আকরাম আলী, খেলাফত আন্দোলন থেকে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বকুল এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে ফারুক ফকির প্রচার চালাচ্ছেন।

ফরিদপুর-৩ (সদর)

এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছেন:

জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোশাররফ আলীর ছেলে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ইছা।

বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ তনয়া, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

অ্যাডভোকেট ইছা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আশির দশকে তিনি জেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এবং দীর্ঘ ৪৬ বছরে চারবার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমানেও তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৬ সালে ‘স্বৈরাচার হাসিনার আমলে’ রাজপথে গুলিবিদ্ধ হন এবং ‘আওয়ামী শাসনের সময়’ বহুবার আহত ও কারা নির্যাতিত হয়েছেন। তিনি বলেন, পূর্বে চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের প্রতি শ্রদ্ধাবশত দলীয় মনোনয়ন চাননি, তবে বর্তমানে নেতাকর্মীরা তাকেই যোগ্য মনে করছেন এবং তিনি আশা করেন দলও তার ওপর আস্থা রাখবে।

নায়াব ইউসুফ বলেন, “আমরা অসহায় মানুষের জীবন মানের উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করি। মানুষ প্রয়োজনে আমাকে পাশে পাবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য আমার কাজ করার ইচ্ছা আছে। তাই আগামী নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ‘গ্রিন সিগনাল’ দিয়েছেন। আসনটি বিএনপিকে উপহার দিতে পারব বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।”

এছাড়াও কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সভাপতি মাহাবুবুল হোসেন পিংকু বিএনপির টিকিট প্রত্যাশা করলেও নির্বাচনের মাঠে তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।

জামায়াত থেকে নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন দলটির কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক আবদুত তওয়াব। তিনি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

ফরিদপুর-৪(সদরপুর, ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন)

এই আসনটিতে বিএনপির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব শূন্যতা, পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকা এবং নেতৃত্বে দুর্বলতার কারণে সাংগঠনিক কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম খান বাবুল বিএনপির পক্ষে নির্বাচনি প্রচার শুরু করলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি ভোটের মাঠ তৈরির পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া বিএনপিকে চাঙ্গা করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন।

আসনটি থেকে বিএনপির আরেকজন মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহিরুল হক শাহজাদা মিয়া। তিনি ভোটারদের আস্থা বাড়াতে নিয়মিত সভা-সমাবেশ, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন।

শাহজাদা মিয়া বলেন, “শ্রদ্ধেয় কেএম ওবায়দুর রহমান ও চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের পর আমিই ফরিদপুরের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা। দীর্ঘ ২২ বছর জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। আমার স্ত্রী ইয়াসমীন আরা হক দুই বারের সংসদ সদস্য। এবার দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে শতভাগ আশাবাদী।”

সদরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কাজী বদরুজ্জামান বদু ‘আমার দেশ’কে জানান, দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই তারা কাজ করবেন।

জামায়াত প্রার্থী সরোয়ার হোসেনের উল্লেখযোগ্য কোনো গণসংযোগ লক্ষ্য করা যায়নি। তার নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এখানে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মিজানুর রহমান গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করলেও সাধারণ ভোটারদের মতে তিনি ভোটের হিসাবে পিছিয়ে আছেন। এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থপতি মুজাহিদ বেগ পোস্টার সাঁটিয়ে এলাকায় নিজের জানান দিচ্ছেন।

ভোটার ফয়সাল সরদার বলেন, “আমরা আগামী নির্বাচনে দুর্নীতিবাজ, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারকারী, চাঁদাবাজ ও স্বার্থান্বেষী কাউকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাই না। আমরা একজন সৎ ও দেশপ্রেমিক নেতা আশা করি। অন্যথায় জুলাই বিপ্লবের হাজারো প্রাণ বিসর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।”

সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) ফরিদপুর জেলা শাখার সাবেক সভাপতি এবং ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক আলতাফ হোসেন বলেন, “১৯৭০ সাল থেকে নির্বাচনগুলো দেখছি। আগের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত উৎসবমুখর। কিন্তু গত তিনটি নির্বাচনে সে উৎসব হারিয়ে যায়। আগামীতে একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের আশা করছি। মাঝে মাঝে ভয় হয় যে এই নির্বাচনটিও কোনো বিশেষ দল ছিনিয়ে নেবে কিনা। কিন্তু তারপরও আমি আশাবাদী যে আগামীতে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।”